শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলা: ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ খারিজ করল কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ

কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় প্রায় ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বাতিলের একক বেঞ্চের নির্দেশকে খারিজ করে দিয়েছে। বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি রীতব্রত কুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের (বর্তমানে বিজেপি লোকসভার সদস্য) দেওয়া ২০২৩ সালের রায়টি বাতিল করে দেয়।
প্রেক্ষাপট: ২০১৪ সালের শিক্ষক যোগ্যতা পরীক্ষা (টিইটি)-এর ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ (WBBPE) প্রায় ৪২,৫০০ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ করেছিল। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যেখানে চাকরির বিনিময়ে নগদ অর্থের লেনদেন হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের সিঙ্গল বেঞ্চ এই ৩২,০০০ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছিল। একক বেঞ্চের রায়ের মূল কারণগুলির মধ্যে ছিল— নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অ্যাপটিটিউড টেস্ট (যোগ্যতা পরীক্ষা) না করানো, একটি বাইরের সংস্থাকে দিয়ে প্রক্রিয়া পরিচালনা করানো এবং বোর্ডের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে চাকরি বিক্রির মাধ্যমে দুর্নীতি করার অভিযোগ।
ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ: সিঙ্গল বেঞ্চের রায় খারিজ করার সময় ডিভিশন বেঞ্চ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। বেঞ্চ বলেছে যে আদালতকে সমস্ত ব্যাখ্যা বাতিল করে দেওয়ার জন্য ‘ঘুরে বেড়ানো অনুসন্ধান’ (roving inquiry) করা উচিত নয়। দুর্নীতি বা গণ-প্রতারণার প্রমাণিত মামলার সঙ্গে প্রমাণের অভাবে থাকা দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ডিভিশন বেঞ্চ আরও মন্তব্য করে যে, শুধুমাত্র অ্যাপটিটিউড টেস্ট না হওয়ার কারণে বা অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো পরীক্ষা বাতিল করা যায় না। সামগ্রিক পরীক্ষা বাতিল করার জন্য ‘সিস্টেমিক ম্যালিস’ বা পদ্ধতিগত দুরভিসন্ধির স্পষ্ট প্রমাণ থাকা আবশ্যক, যা এই ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি। বেঞ্চ আরও উল্লেখ করে যে, নিযুক্ত শিক্ষকদের কার্যকারিতা নিয়েও কোনো অভিযোগ নেই।
আদালত এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যে, প্রায় নয় বছর চাকরি করার পর যদি কারো চাকরি চলে যায়, তবে তা তাদের জন্য চরম কষ্টের কারণ হবে। এছাড়াও, কোনো প্রমাণ ছাড়া কেবল কিছু ব্যর্থ প্রার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ঠিক হবে না। বেঞ্চের মতে, যে সকল শিক্ষকের নিয়োগে কোনো দুর্নীতি নেই, তারাও এর ফলে চরম কলঙ্ক ও ভোগান্তির শিকার হতে পারেন। চলমান ফৌজদারি মামলার ভিত্তিতেও চাকরি বাতিল করা যায় না—এই মন্তব্য করে ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গল বেঞ্চের রায়টি বাতিল করে দেয়।



