উইল ছাড়া পৈতৃক সম্পত্তি বন্টন: হিন্দু, মুসলিম এবং খ্রিস্টান আইনের উত্তরাধিকার নীতি ও আদালতের গুরুত্বপূর্ণ রায়

কোনো ব্যক্তি যদি উইল বা ওসিয়ত (Will/Wasiyat) না করে মারা যান, তবে সেই পরিস্থিতিকে উইলবিহীন উত্তরাধিকার (Intestate Succession) বলা হয়। সেক্ষেত্রে তাঁর সম্পত্তি কীভাবে বন্টন হবে, তা নির্ভর করে মৃত ব্যক্তি কোন ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের (Personal Law) অধীন ছিলেন তার উপর। ভারতে প্রধানত হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬ (Hindu Succession Act, 1956) এবং মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত)-এর অধীনে সম্পত্তি বন্টন হয়।
১. হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬ (Hindu Succession Act, 1956)
হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখ ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য। উইল ছাড়া মৃত্যু হলে সম্পত্তিকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
ক. প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারী (Class I Heirs):
এই উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির ওপর সর্বাধিক অধিকার রাখেন এবং এঁদের উপস্থিতিতে অন্য শ্রেণির উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি পান না। এঁরা সবাই সম্পত্তির সমান অংশ পান।
-
অন্তর্ভুক্ত: পুত্র/কন্যা, মা, মৃত পুত্রের পুত্র/কন্যা, মৃত কন্যার পুত্র/কন্যা, বিধবা স্ত্রী।
খ. দ্বিতীয় শ্রেণির উত্তরাধিকারী (Class II Heirs):
প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারী কেউ না থাকলে এই শ্রেণির ব্যক্তিরা সম্পত্তি পান (যেমন: বাবা, ভাই/বোন, দাদা/দাদি)।
গ. লিঙ্গ মতার নীতি এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়:
-
হিন্দু উত্তরাধিকার (সংশোধনী) আইন, ২০০৫: এই সংশোধনী অনুসারে, পৈতৃক সম্পত্তিতে কন্যাদেরকে পুত্রের সমান জন্মগত অধিকার (Coparcenary Right) দেওয়া হয়েছে।
-
বিনিতা শর্মা বনাম রাকেশ শর্মা (Vineeta Sharma vs Rakesh Sharma, 2020) রায়: সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে, কন্যা ২০০৫ সালের আগে জন্মগ্রহণ করলেও, তিনি পিতার পৈতৃক সম্পত্তিতে পুত্রের সমান অধিকার পাবেন, যদি না ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৫ তারিখের আগে সম্পত্তির আইনি বন্টন (Partition) সম্পন্ন হয়ে যায়। এই রায় হিন্দু মেয়েদের সম্পত্তির ওপর অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
২. মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim Personal Law – Shariat)
মুসলিম আইনে উইলবিহীন উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সম্পত্তি বন্টন হয় মুসলিম পার্সোনাল ল’ (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ দ্বারা। এই আইনে পৈতৃক বা স্ব-অর্জিত সম্পত্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
ক. উত্তরাধিকারীর শ্রেণিবিন্যাস:
মুসলিম উত্তরাধিকারীগণ প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত হন:
১. শরার্স (Sharers / অংশীদার): এঁরা সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ পান (যেমন: স্ত্রী, মা, কন্যা)। ২. রেসিডুয়ারিস (Residuaries / অবশিষ্ট উত্তরাধিকারী): শরার্সদের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি এঁদের মধ্যে বন্টন হয় (যেমন: পুত্র, ভাই)। ৩. ডিস্ট্যান্ট কিন্ড্রেড (Distant Kindred / দূরবর্তী আত্মীয়): এই দুই শ্রেণির কেউ না থাকলে এঁরা সম্পত্তি পান।
খ. বন্টনের মূলনীতি (২:১ অনুপাত):
মুসলিম আইনে পুরুষ উত্তরাধিকারী (পুত্র)-এর অংশ নারী উত্তরাধিকারী (কন্যা)-এর অংশের দ্বিগুণ হয় (২:১)। উদাহরণস্বরূপ, যদি মৃত ব্যক্তির কেবল পুত্র এবং কন্যা থাকে, তবে কন্যা পুত্রের অর্ধেক অংশ পাবেন।
-
মৃতের স্ত্রী (যদি সন্তান থাকে): ১/৮ ভাগ পান।
-
মৃতের স্ত্রী (যদি সন্তান না থাকে): ১/৪ ভাগ পান।
গ. উইল করার সীমাবদ্ধতা:
একজন মুসলিম কেবল তাঁর মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ (১/৩)-এর বেশি উইল করতে পারেন না। বাকি অংশ অবশ্যই শরিয়ত আইন মেনে বন্টন করতে হবে।
৩. অন্যান্য আইন:
-
খ্রিস্টান এবং পার্সী: তাঁদের উত্তরাধিকার ইন্ডিয়ান সাকসেশন অ্যাক্ট, ১৯২৫ (Indian Succession Act, 1925) দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানেও লিঙ্গভেদে তেমন কোনো পার্থক্য করা হয় না এবং মৃত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয়রা সম্পত্তির সমান অংশ পান।
উপসংহার:
উইলবিহীন উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে, সম্পত্তি বন্টন করার মূল চাবিকাঠি হলো মৃত ব্যক্তি কোন ব্যক্তিগত আইনের অধীন ছিলেন তা নির্ধারণ করা। যেকোনো বিরোধ দেখা দিলে, কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইন নয়, বরং সুপ্রিম কোর্টের ল্যান্ডমার্ক রায়গুলি আইনি প্রক্রিয়াকে পরিচালনা করে এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।



