সুপ্রিমকোর্ট

ঐতিহাসিক রায়: ভারতে প্রথমবার প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া বা সসম্মানে মৃত্যুর অনুমতি

ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও মানবিক রায় দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’ বা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় থাকা ৩১ বছর বয়সী যুবক হরিশ রানার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ বা উন্নত চিকিৎসা সহায়তা প্রত্যাহারের মাধ্যমে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুর অধিকার দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের বাসিন্দা হরিশ রানা ২০১৩ সালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় একটি ভবনের চতুর্থ তলা থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। সেই থেকেই তিনি শয্যাশায়ী এবং বহির্জগতের সঙ্গে তাঁর সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছিলেন না এবং সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

বাবা-মায়ের আবেদন ও আদালতের পর্যবেক্ষণ

ছেলের কোনো উন্নতি না দেখে এবং দিনের পর দিন তাঁর কষ্ট প্রত্যক্ষ করে রানার বাবা-মা আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁদের আবেদন ছিল, চিকিৎসকরা যেখানে সুস্থ হওয়ার কোনো আশা দেখছেন না, সেখানে কৃত্রিমভাবে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা এক প্রকার যন্ত্রণা। বিচারপতি জে.বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে.ভি. বিশ্বনাথনের বেঞ্চ বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করেন। আদালত দুটি পৃথক মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্ট খতিয়ে দেখে নিশ্চিত হয় যে, রানার শারীরিক অবস্থার উন্নতির আর কোনো সম্ভাবনা নেই।

রায়ের গুরুত্ব

২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট ‘রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি’ বা মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে স্বীকৃতি দিলেও, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। আদালত দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-কে নির্দেশ দিয়েছে যেন অত্যন্ত মানবিক ও সম্মানজনকভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

আইনি মাইলফলক

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতির শিকার হওয়া রোগীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে যারা স্থায়ীভাবে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আছেন এবং যাদের ফেরার কোনো পথ নেই, তাঁদের পরিবারের কষ্ট লাঘবে এটি সাহায্য করবে। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া নিয়ে একটি স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে বলেছে।

এই রায় কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং জীবনের শেষলগ্নে একজন মানুষের যন্ত্রণামুক্ত হওয়ার ও সসম্মানে বিদায় নেওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button