ইউএপিএ (UAPA) মামলায় ৩৪ মাস হাজতবাসের পর জামিন মঞ্জুর: “বিচার পেতে দেরি হলে তা সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন” – পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট

পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট সম্প্রতি এক যুগান্তকারী রায়ে সন্ত্রাস দমন আইন ইউএপিএ (Unlawful Activities (Prevention) Act)-এর অধীনে গ্রেপ্তার হওয়া এক অভিযুক্তকে জামিন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অভিযুক্তের নাম প্রিতপাল সিং বাত্রা ওরফে জিফি বাত্রা, যিনি প্রায় তিন বছর বা ৩৪ মাস ধরে বিচার ছাড়াই কারাগারে ছিলেন। বিচারপতি দীপক সিবাল এবং বিচারপতি লপিতা ব্যানার্জির একটি বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায়টি প্রদান করে।
আদালত এই মামলায় স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, যখন কোনো অভিযুক্তকে দীর্ঘ সময় ধরে, বিশেষ করে ইউএপিএ-এর মতো কঠোর আইনে, কোনো চার্জ গঠন না করেই আটকে রাখা হয় এবং বিচার শুরু হতে দেরি হয়, তখন তা ভারতীয় সংবিধানের ২১ ধারায় প্রদত্ত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং জীবনধারণের অধিকার লঙ্ঘন করে।
মামলার পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট দেখেছে যে, অভিযুক্ত বাত্রা প্রাথমিক এফআইআর-এ নামাঙ্কিত ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যপক্ষের মামলাটি মূলত সহ-অভিযুক্তদের পুলিশের হেফাজতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, যেটিকে আদালত দুর্বল প্রমাণ হিসেবে গণ্য করেছে।
গুরুত্বপূর্ণভাবে, আদালত ইউএপিএ-এর অধীনে আনা প্রধান অভিযোগগুলির সত্যতা প্রমাণের ক্ষেত্রে ঘাটতি খুঁজে পেয়েছে। আদালত নোট করে যে— বাত্রা যে দুই অভিযুক্তের নির্দেশে অস্ত্র লুকিয়েছিলেন বলে অভিযোগ, সেই দুই ব্যক্তি এবং বাত্রা একই জেলে ছিলেন কি না, তার কোনো প্রমাণ নেই; তাদের মধ্যে কোনো ফোন কল বা হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগের রেকর্ডও নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সঙ্গে কোনো পরিকল্পিত বা সংঘটিত সন্ত্রাসী কাজের সংযোগ প্রমাণ করতে পারেনি প্রসিকিউশন।
আদালত আরও উল্লেখ করেছে যে, তদন্ত শেষ হলেও বাত্রার বিরুদ্ধে এত দিন চার্জ গঠন করা যায়নি, কারণ ইউএপিএ-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী মামলাটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজ্য সরকার অনুমতি (sanction) দেয়নি, যার ফলে অভিযুক্তের কারাবাস দীর্ঘায়িত হয়েছে।
বেঞ্চ সুপ্রিম কোর্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায়ের (যেমন: কে.এ. নাজিব, জালালউদ্দিন খান) ওপর নির্ভর করে এই সিদ্ধান্তে আসে যে, দীর্ঘ হাজতবাস ও বিচার প্রক্রিয়ার অনির্দিষ্ট বিলম্ব নিজেই জামিন মঞ্জুরের জন্য যথেষ্ট কারণ হতে পারে। আদালত মনে করে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-এর ৪৩-ডি(৫) ধারা অনুযায়ী জামিন বাতিলের জন্য যে অভিযোগটি ‘প্রাথমিকভাবে সত্য’ বলে মনে হওয়ার প্রয়োজন, সেই যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি এই মামলায় ছিল না।
এই রায়টি সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা দেখায় যে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও বিচারহীন দীর্ঘ বন্দিদশা গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত বাত্রাকে জামিন দিলেও, তাঁকে ১০ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড, পাসপোর্ট জমা দেওয়া এবং নিয়মিত হাজিরা দেওয়াসহ বেশ কিছু কঠোর শর্ত মেনে চলতে হবে।



