‘ট্রান্সফার সার্টিফিকেট’ দিয়ে নাবালকত্ব প্রমাণ করা যায় না: নাবালিকা কল্যাণ কমিটির হেফাজতের আদেশ বাতিল করল এলাহাবাদ হাইকোর্ট

১. ঘটনার পটভূমি
একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছে যে, জুভেনাইল জাস্টিস (জেজে) অ্যাক্ট অনুসারে বয়স প্রমাণের জন্য শুধুমাত্র স্কুলের ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (TC) বা ভর্তি রেজিস্টারের এন্ট্রি যথেষ্ট নয়। এই রায়ের ফলে, শুধুমাত্র অ-যাচাইকৃত স্কুল রেকর্ডের ভিত্তিতে নাবালিকা হিসাবে গণ্য করে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি (CWC) যে নারীকে সরকারি শিশু গৃহে রেখেছিল, আদালত তাঁর মুক্তির নির্দেশ দেয়।
-
মামলার উৎপত্তি: ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, যখন মহিলার মা অপহৃত হওয়ার অভিযোগ এনে একটি এফআইআর দায়ের করেন।
-
বিবাদীর দাবি: এফআইআর-এ মা দাবি করেন যে তাঁর মেয়ের জন্ম তারিখ ১১ মে ২০০৮। তবে, আবেদনকারী পক্ষ দাবি করে, মেয়েটির জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ২০০৫, এবং সে ইতিমধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক।
-
মহিলার অবস্থান: মেয়েটি (মামলার ক্ষেত্রে রোহিনী) তার স্বামীর সাথে যৌথভাবে হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস (Habeas Corpus) পিটিশন দায়ের করেন। সে ধারাবাহিকভাবে দাবি করে যে সে তার স্বামীর সাথে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে এবং কোনো জোরজুলুম হয়নি।
২. মূল আবেদনকারী, অভিযুক্ত এবং আইনি ধারা
-
মূল আবেদনকারী: শ্রীমতি রোহিনী (Rohini) এবং তিনি যাকে স্বামী বলে দাবি করেছেন, সেই পেটিশনার নম্বর টু।
-
বিবাদী/কর্তৃপক্ষ: উত্তর প্রদেশ রাজ্য এবং চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি (CWC)।
-
আইনি ধারা: অপহরণের অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং মামলাটি পকসো (POCSO) আদালতের বিচারাধীন ছিল। হাইকোর্টে বন্দিদশার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল।
৩. বিচারিক প্রক্রিয়া ও আদালতের নাম
-
প্রাথমিক প্রক্রিয়া: তদন্তকারী অফিসার Special Judge (POCSO)-এর কাছে আবেদন করেন যে মেয়েটি একাধিকবার পালিয়ে যাওয়ায় তাকে সুরক্ষামূলক হেফাজতে রাখা হোক। স্পেশাল জজ বিষয়টি চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি (CWC)-এর কাছে পাঠান।
-
CWC-এর নির্দেশ: CWC প্রথমে মেয়েটিকে ফোস্টার কেয়ারে রাখে এবং পরে ৩০ জুলাই ২০২৫-এর আদেশে তাকে কানপুরের সরকারি শিশু গৃহে (Government Children Home) রাখার নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশ CWC শুধুমাত্র স্কুলের ভর্তি এন্ট্রি এবং একটি ট্রান্সফার সার্টিফিকেটের উপর নির্ভর করে দিয়েছিল, যেখানে জন্ম তারিখ ১১ মে ২০০৮ উল্লেখ ছিল।
-
উচ্চ আদালত: এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
-
বিচারপতি/বেঞ্চের নাম: বিচারপতি সলিল কুমার রাই (Justice Salil Kumar Rai) এবং বিচারপতি জাফির আহমদ (Justice Zafeer Ahmad)-এর বেঞ্চ।
৪. আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়
হাইকোর্ট রাজ্যের এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে যে, CWC-এর আদেশ জুভেনাইল জাস্টিস আইনের অধীনে একটি বেঞ্চ হিসাবে কার্যকর, তাই হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন রক্ষণীয় (maintainable) নয়। আদালত জোর দেয় যে, আটকাদেশের আদেশ যদি এখতিয়ারবিহীন হয় বা যান্ত্রিক উপায়ে দেওয়া হয়, তবে হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন বৈধ।
-
জেজে অ্যাক্ট, ৯৪ ধারা লঙ্ঘন: আদালত জোর দিয়ে বলে যে জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের ৯৪ ধারা বয়স নির্ধারণের জন্য একটি কঠোর ক্রম বা পর্যায়ক্রম নির্দিষ্ট করে। স্কুল রেকর্ডগুলির উপর নির্ভর করার আগে স্কুল কর্তৃক ইস্যুকৃত বৈধ জন্ম তারিখের শংসাপত্র (Date of Birth Certificate) বা ম্যাট্রিকুলেশন শংসাপত্র আবশ্যক।
-
ট্রান্সফার সার্টিফিকেটের অবস্থান: হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে যে, ট্রান্সফার সার্টিফিকেট বা স্কুলের ভর্তি রেজিস্টারের এন্ট্রিগুলি জন্ম তারিখের শংসাপত্র নয়।
-
CWC-এর ত্রুটি: CWC বাধ্যতামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেনি:
-
স্কুল প্রিন্সিপালকে তলব করা হয়নি।
-
এন্ট্রির উৎস যাচাই করা হয়নি।
-
জন্ম তারিখ অভিভাবকের মৌখিক বিবৃতির ভিত্তিতে রেকর্ড করা হয়েছিল কিনা, তা যাচাই করা হয়নি।
-
কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেওয়া হয়নি।
-
-
প্রাপ্তবয়স্কতার প্রমাণ: কর্তৃপক্ষগুলির সামনে থাকা একমাত্র নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল মেডিকেল রিপোর্ট, যেখানে তার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি বলে অনুমান করা হয়েছিল। আদালত সিদ্ধান্তে আসে যে রোহিনী জুভেনাইল জাস্টিস আইনের ২(১২) ধারা অনুযায়ী নাবালিকা নয়।
৫. চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশ
চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি যেহেতু আইনত নাবালিকা নয় এমন একজন ব্যক্তিকে হেফাজতে নিয়েছিল, তাই তার আটকাদেশ এখতিয়ারবিহীন (without jurisdiction) এবং অবৈধ বলে গণ্য হয়।
-
আদালতের নির্দেশ: হাইকোর্ট হেবিয়াস কর্পাস রিট জারি করে রোহিনীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
-
স্বাধীনতার ঘোষণা: আদালত ঘোষণা করে যে রোহিনী যেখানে খুশি যেতে এবং যার সাথে খুশি থাকতে স্বাধীন।
৬. রায়ের নির্যাস (গুরুত্ব)
এই যুগান্তকারী রায়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের অধীনে বয়স নির্ধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক ও যাচাইকৃত নথির প্রয়োজন। শুধুমাত্র স্কুলের ট্রান্সফার সার্টিফিকেট বা ভর্তি এন্ট্রিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করে CWC কোনো ব্যক্তিকে নাবালক বা নাবালিকা ঘোষণা করতে পারে না। এটি CWC-এর ক্ষমতা এবং কার্যক্রমের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভারসাম্য তৈরি করল।



