খবরাখবর

গরুমাংস এবং ‘ভালো হিন্দুত্ব’ নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ: সাংবাদিকের FIR খারিজের আবেদন নাকচ করল মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট

সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের (গোয়ালিয়র বেঞ্চ) একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর (FIR) খারিজের আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত সাংবাদিকের নাম বুদ্ধ প্রকাশ বৌদ্ধ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি হোয়াটসঅ্যাপে একটি বিতর্কিত বার্তা ছড়িয়েছিলেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে ঐতিহাসিকভাবে গোমাংস ভক্ষণ ছিল ব্রাহ্মণসহ হিন্দুদের কিছু প্রাচীন রীতিনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ‘ভালো হিন্দু’ হতে গেলে তা প্রয়োজন ছিল। এই বার্তা ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছে বলে অভিযোগ।

সাংবাদিক বুদ্ধ প্রকাশ বৌদ্ধ একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ‘বি পি বৌদ্ধ সাংবাদিক নিউজ গ্রুপ’-এর একমাত্র অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর মাধ্যমে ফরওয়ার্ড করা সাত পাতার এই বার্তাটিতে প্রাচীন হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান, বলির প্রথা, এবং ব্রাহ্মণদের দ্বারা গোমাংস ভক্ষণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়েছিল। অভিযোগকারী দাবি করেন, এই বিষয়গুলি অত্যন্ত মানহানিকর, বিভ্রান্তিকর এবং হিন্দু ও ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে মারাত্মক আঘাত হানতে সক্ষম। এমনকি এর ফলে সমাজে বিদ্বেষ ছড়ানোরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ভিণ্ড জেলার দবো থানার পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) বিভিন্ন ধারায় (যেমন জনসমক্ষে অসন্তোষ তৈরি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে বক্তব্য ইত্যাদি) এফআইআর নথিভুক্ত করে।

সাংবাদিক তাঁর আবেদনে যুক্তি দেন যে তিনি কোনো বিদ্বেষমূলক কাজ করেননি। তিনি জানান, ফরওয়ার্ড করা বার্তাটি ছিল ডঃ সুরেন্দ্র কুমার শর্মা (অজ্ঞাত) রচিত একটি প্রকাশিত শিক্ষামূলক বইয়ের অংশ। তাঁর দাবি, এই তথ্যগুলি সর্বজনীনভাবে উপলব্ধ একাডেমিক সাহিত্য থেকে নেওয়া এবং সাংবাদিকতামূলক আলোচনার অংশ হিসেবে শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত গ্রুপে শেয়ার করা হয়েছিল। ফলে, এটি তাঁর সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ক)) দ্বারা সুরক্ষিত। একই সঙ্গে তিনি আরও অভিযোগ করেন যে পুলিশের অপকর্ম নিয়ে তাঁর আগের রিপোর্টিংয়ের প্রতিশোধ নিতেই এই এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।

কিন্তু বিচারপতি মিলিন্দ রমেশ ফাড়কের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আবেদনটি খারিজ করে দেয়। আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, অভিযোগগুলি আপাতদৃষ্টিতে দণ্ডনীয় অপরাধের উপাদান প্রকাশ করছে। হাইকোর্ট এফআইআর খারিজ করার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পূর্বনির্ধারিত নীতির পুনরাবৃত্তি করে জানায় যে, শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই এফআইআর বাতিল করা সম্ভব, যেমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি না থাকলে বা তা স্পষ্টতই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে।

আদালত জোর দিয়ে বলেছে, বার্তাটি শিক্ষামূলক ছিল কি না, সাংবাদিক সদিচ্ছার সঙ্গে কাজ করেছিলেন কি না, এর মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল কি না, অথবা এফআইআরটি প্রতিশোধমূলক কি না – এই সমস্ত বিষয়গুলিই নিছক তথ্যগত প্রশ্ন। এই সমস্ত বিতর্কের সত্যতা প্রমাণের জন্য তদন্ত প্রয়োজন এবং প্রমাণ যাচাই না করে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়েই মামলা বাতিল করা যায় না। যেহেতু এফআইআর-এ আনা অভিযোগগুলিতে আপাতদৃষ্টিতে অপরাধের উপাদান রয়েছে, তাই আদালত এই পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হয়নি এবং তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত প্রমাণ করেছে যে বাকস্বাধীনতার অধিকার সমাজের ধর্মীয় সংবেদনশীলতার সঙ্গে সংঘাতে এলে, বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button