আইনশিক্ষা

বিবাহবিচ্ছেদের পর স্ত্রী বা সন্তানের ভরণপোষণ (Alimony) কিভাবে দাবি করা যায়?

বিবাহ বিচ্ছেদের পর স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ (Alimony) দাবি করার আইনি প্রক্রিয়া

বিবাহবিচ্ছেদের পর স্ত্রী এবং সন্তানের ভরণপোষণ বা আর্থিক সহায়তা দাবি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অধিকার। ভারতীয় আইন ব্যবস্থায়, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মহিলাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আইন থাকলেও, মূল উদ্দেশ্য হলো আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখানে ভারতীয় আইন অনুসারে ভরণপোষণ (Alimony/Maintenance) দাবি করার সহজ সরল প্রক্রিয়া ও আইনি ধাপগুলি আলোচনা করা হলো:

ভরণপোষণ সংক্রান্ত আইনি বিধান (Legal Provisions for Maintenance)

ভারতে সাধারণত দুটি প্রধান আইনের মাধ্যমে ভরণপোষণ দাবি করা যায়:

১. ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯৭৩ এর ধারা ১২৫ (Section 125 of CrPC, 1973): এটি একটি ধর্ম-নিরপেক্ষ (Secular) আইন। এই ধারার অধীনে স্ত্রী (যদি তিনি নিজেকে ভরণপোষণ দিতে অক্ষম হন) এবং নাবালক সন্তানেরা (যে কোনো ধর্ম নির্বিশেষে) দ্রুত এবং সহজে ভরণপোষণ দাবি করতে পারে। ২. ব্যক্তিগত আইন (Personal Laws): * হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (Hindu Marriage Act, 1955): ধারা ২৪ (মামলা চলাকালীন ভরণপোষণ) এবং ধারা ২৫ (স্থায়ী ভরণপোষণ বা Alimony)। * মুসলিম মহিলা (বিবাহবিচ্ছেদ অধিকার সুরক্ষা) আইন, ১৯৮৬ (Muslim Women Act, 1986): বিবাহবিচ্ছেদের পর ভরণপোষণ ও ইদ্দতকালীন প্রাপ্য দাবি করার বিধান রয়েছে। * বিশেষ বিবাহ আইন, ১৯৫৪ (Special Marriage Act, 1954): এই আইনেও একই ধরনের ধারা ২৪ এবং ২৫ রয়েছে।

ভরণপোষণ (Alimony/Maintenance) দাবি করার আইনি ধাপসমূহ

ভরণপোষণ দাবির প্রক্রিয়া মূলত দুটি পর্যায়ে ঘটে: মামলা চলাকালীন এবং স্থায়ীভাবে বিবাহবিচ্ছেদের পর

ধাপ ১: আইন নির্বাচন ও আবেদন (Choosing the Law and Filing the Petition)

  • স্ত্রী ও সন্তানের জন্য যৌথ দাবি: যদি দ্রুত ও ধর্ম-নিরপেক্ষ উপায়ে ভরণপোষণ দাবি করতে হয়, তবে ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) এর ধারা ১২৫ এর অধীনে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করতে হবে। এই আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

  • স্থায়ী ভরণপোষণ (Alimony): যদি বিবাহবিচ্ছেদের মামলা চলাকালীন বা পরে স্থায়ীভাবে এককালীন বা মাসিক ভরণপোষণ দাবি করতে হয়, তবে হিন্দু বা বিশেষ বিবাহ আইনের ধারা ২৫ এর অধীনে পারিবারিক আদালতে (Family Court) আবেদন করতে হবে।

  • মামলা চলাকালীন ভরণপোষণ (Interim Maintenance): বিবাহবিচ্ছেদের মামলা চলাকালীন, দ্রুত আর্থিক সহায়তা পেতে সংশ্লিষ্ট বিবাহ আইনের (যেমন হিন্দু বিবাহ আইনের ধারা ২৪) অধীনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণের আবেদন করতে হবে।

ধাপ ২: আবেদনপত্র তৈরি ও দাখিল (Drafting and Filing the Petition)

আবেদনপত্রে নিম্নলিখিত তথ্যগুলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে:

  • আবেদনকারীর আর্থিক অক্ষমতা: কেন স্ত্রী বা সন্তানরা নিজেদের ভরণপোষণ দিতে অক্ষম।

  • বিবাদীর আর্থিক অবস্থা: স্বামীর আয়ের উৎস, সম্পদ এবং আর্থিক দায়বদ্ধতার বিস্তারিত তথ্য।

  • প্রয়োজনীয় খরচ: মাসিক ভিত্তিতে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের আনুমানিক পরিমাণ।

  • আয় ও সম্পদের হলফনামা: বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে, উভয় পক্ষকে তাদের আয়, দায় এবং সম্পদের সম্পূর্ণ বিবরণ সহ একটি হলফনামা (Affidavit of Assets and Liabilities) দাখিল করতে হয়।

ধাপ ৩: বিবাদীকে নোটিশ ও শুনানির প্রক্রিয়া (Notice and Hearing Process)

  • আদালত বিবাদীর (স্বামীর) কাছে একটি নোটিশ জারি করবে।

  • স্বামী জবাব দাখিল করবেন। সেখানে তিনি স্ত্রীর দাবির বিরোধিতা করতে পারেন এবং নিজের আর্থিক অবস্থার বর্ণনা দেবেন।

  • আদালত উভয় পক্ষের দাখিল করা নথি, বিশেষ করে আয় ও সম্পদের হলফনামাগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করবে।

ধাপ ৪: অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ (Interim Order)

অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। আদালত চূড়ান্ত রায় আসার আগে আবেদনকারীকে সাময়িক আর্থিক স্বস্তি দিতে স্বামীর আয়ের ভিত্তিতে একটি মাসিক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের নির্দেশ দিতে পারে।

ধাপ ৫: চূড়ান্ত আদেশ (Final Order)

  • ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ: আদালত স্বামীর আয়, জীবনযাত্রার মান, স্ত্রীর বয়স, কর্মক্ষমতা এবং সন্তানদের প্রয়োজন বিবেচনা করে চূড়ান্ত ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করে।

  • প্রকার: এটি মাসিক ভাতা (Periodical Payment) হিসেবে হতে পারে অথবা এককালীন নিষ্পত্তি (Lump-sum Settlement) হিসেবেও দেওয়া হতে পারে।

ধাপ ৬: আদেশ কার্যকর করা (Enforcement of Order)

যদি স্বামী আদালতের আদেশ মেনে টাকা না দেন, তবে:

  • CrPC এর ধারা ১২৫: আদালত স্বামীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা ওয়ারেন্ট জারি করতে পারে এবং এক মাস পর্যন্ত জেলে পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারে।

  • অন্যান্য আইন: পারিবারিক আদালত বকেয়া অর্থ পুনরুদ্ধার বা স্বামীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা (Contempt of Court) শুরু করতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button