
ভূমিকা: মিউচুয়াল ডিভোর্স কী?
পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ বা মিউচুয়াল ডিভোর্স হলো বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করার একটি সরল এবং শান্তিপূর্ণ আইনি পদ্ধতি। যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়ই স্বেচ্ছায় ও সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা আর দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাবেন না, তখনই এই পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। ভারতে, মূলত হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর ধারা ১৩বি (Section 13B of the Hindu Marriage Act, 1955) অনুসারে এই বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর করা হয়। অন্যান্য ব্যক্তিগত আইনেও (যেমন স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট) প্রায় একই ধরনের বিধান রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মূল সুবিধা হলো এটি দ্রুত, তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং উভয় পক্ষের জন্য মানসিক চাপ কমায়, কারণ এখানে কোনো পক্ষকে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে দোষারোপ করতে হয় না।
মিউচুয়াল ডিভোর্স করার মূল শর্তাবলী
ধারা ১৩বি অনুসারে বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর করার জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলি পূরণ করা আবশ্যক:
১. এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে আলাদা থাকা: আবেদন করার তারিখের ঠিক আগে কমপক্ষে এক বছর ধরে স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা থাকতে হবে। ২. পারস্পরিক সম্মতি: স্বামী ও স্ত্রী উভয়কেই বিবাহবিচ্ছেদের জন্য স্পষ্টভাবে এবং স্বেচ্ছায় সম্মত হতে হবে। ৩. পুনর্মিলন অসম্ভব: উভয় পক্ষের কাছেই মনে হতে হবে যে তাঁদের মধ্যে আর কোনোভাবে পুনর্মিলন সম্ভব নয় এবং তাঁরা এখন বিবাহবিচ্ছেদ করেই এই সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে চান।
বিবাহবিচ্ছেদের সহজ সরল প্রক্রিয়া (দুটি পর্যায়ে):
মিউচুয়াল ডিভোর্স প্রক্রিয়া সাধারণত দুটি প্রধান পর্যায়ে সম্পন্ন হয়:
প্রথম পর্যায় (First Motion Petition): আবেদন জমা দেওয়া
১. আবেদন প্রস্তুতি: স্বামী-স্ত্রী দুজন একজন আইনজীবীর মাধ্যমে যৌথভাবে আদালতের কাছে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য একটি যৌথ আবেদনপত্র (First Motion Petition) প্রস্তুত করেন। ২. আবেদনে উল্লেখ: এই আবেদনে বিবাহ এবং বিচ্ছেদের কারণ, কতদিন ধরে তাঁরা আলাদা থাকছেন, এবং কেন পুনর্মিলন সম্ভব নয়—এই সব তথ্য উল্লেখ করা হয়। ৩. সম্পত্তির নিষ্পত্তি: এই পর্যায়ে ভরণপোষণ (Alimony), সন্তানের অভিভাবকত্ব (Child Custody) এবং সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা-র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি চূড়ান্ত বোঝাপড়া বা মীমাংসাপত্র তৈরি করা হয়। ৪. আদালতে জমা ও সাক্ষ্য গ্রহণ: স্বামী-স্ত্রী দুজনেই আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আবেদনপত্র জমা দেন। বিচারক নিশ্চিত হন যে সম্মতিটি স্বেচ্ছামূলক এবং চাপমুক্ত। আদালত এই আবেদনটি নথিভুক্ত করে।
দ্বিতীয় পর্যায় (Second Motion Petition): চূড়ান্ত রায়
১. ৬ মাসের বাধ্যতামূলক বিরতি (Cooling-off Period): প্রথম আবেদন জমা দেওয়ার পরে আইন অনুসারে আদালত সাধারণত ৬ মাসের একটি বাধ্যতামূলক বিরতি দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো, এই সময়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী যেন তাঁদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ পান। ২. দ্বিতীয় আবেদন: ৬ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর (কিন্তু ১৮ মাসের মধ্যে), স্বামী-স্ত্রীকে আবার আদালতে উপস্থিত হয়ে দ্বিতীয় আবেদনপত্র (Second Motion Petition) জমা দিতে হয়। এই আবেদনে তাঁরা নিশ্চিত করেন যে তাঁরা এখনও বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে অটল এবং তাঁদের মধ্যে কোনো পুনর্মিলন হয়নি। ৩. চূড়ান্ত সাক্ষ্য গ্রহণ: বিচারক পুনরায় উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন এবং নিশ্চিত হন যে বিচ্ছেদের সম্মতি অটল রয়েছে। ৪. বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর: সমস্ত শর্ত পূরণ হলে এবং আদালত সন্তুষ্ট হলে, বিচারক বিবাহবিচ্ছেদের রায় (Decree of Divorce) প্রদান করেন। এর মাধ্যমে তাঁদের বিবাহ বন্ধন আইনত ছিন্ন হয়।
সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: ৬ মাসের সময়সীমা শিথিলকরণ
সাধারণত, প্রথম আবেদন এবং দ্বিতীয় আবেদনের মধ্যে ৬ মাসের বিরতি বাধ্যতামূলক। তবে, এই প্রক্রিয়াকে দ্রুত করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
অমরদীপ সিং বনাম হরভিন কাউর (Amardeep Singh vs Harveen Kaur, 2017) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছে যে, ক্ষেত্রবিশেষে যদি আদালত মনে করে যে স্বামী-স্ত্রী ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আলাদা থাকছেন এবং পুনর্মিলনের আর কোনো সম্ভাবনা নেই, তাহলে এই ৬ মাসের বাধ্যতামূলক বিরতিটি বাতিল বা মকুব করা যেতে পারে (waived off)।
সুপ্রিম কোর্ট জানায়, যদি বিবাহটি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যায় এবং উভয় পক্ষই দ্রুত মুক্তি চায়, তবে আবেদন করার পর ৬ মাসের অপেক্ষা করাটা কেবল যন্ত্রণা বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয়। এই রায়ের ফলে, এখন অনেক ক্ষেত্রে বিচারকের বিবেচনার ভিত্তিতে দ্রুত বিবাহবিচ্ছেদ সম্ভব হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা মনে রাখবেন
-
বিচ্ছেদ অসম্পূর্ণ: প্রথম আবেদন মঞ্জুর হলেই বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয় না; চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত তাঁরা আইনত স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই গণ্য হন।
-
সম্মতি প্রত্যাহার: দ্বিতীয় আবেদন মঞ্জুরের আগে স্বামী বা স্ত্রীর যেকোনো একজন যদি তাঁদের সম্মতি প্রত্যাহার করে নেন, তবে বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সেখানেই বাতিল হয়ে যাবে।
-
মীমাংসাপত্র: সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং আর্থিক বিষয়গুলির নিষ্পত্তি প্রথম আবেদনের সময়েই একটি লিখিত মীমাংসাপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করে নেওয়া উচিত, যা পরে আদালতে জমা দেওয়া হয়।
পরিশেষে বলা যায়, পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ হলো একটি দায়িত্বশীল পথ যা আইন মানুষের জন্য সহজ করেছে। আদালতের রায় অনুসরণ করে এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনে চললে এই বিচ্ছেদ শান্তিতে ও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব।



