সুপ্রিমকোর্ট

বিচার ব্যবস্থা যেন প্রহসন, চূড়ান্ত ক্ষোভ প্রকাশ সুপ্রিম কোর্টের

অ্যাসিড হামলার বিচার ১৫ বছর ধরে বিলম্বিত, সুপ্রিম কোর্ট বলল: ‘আইনি ব্যবস্থার এ কেমন উপহাস?

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি অ্যাসিড হামলার একটি মামলায় বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। একটি মামলায় ১৫ বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ার ঘটনাকে আদালত ‘জাতীয় লজ্জা’ এবং ‘আইনি ব্যবস্থার উপহাস’ বলে অভিহিত করেছে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির একটি বেঞ্চ একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) শুনানিতে এই মন্তব্য করে। এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করেছিলেন অ্যাসিড হামলায় বেঁচে যাওয়া শাহীন মালিক, যিনি একাই তার মামলায় সুবিচারের জন্য লড়াই করছেন এবং একইসঙ্গে অন্যান্য অ্যাসিড আক্রান্তদের অধিকারের জন্য কাজ করছেন।

মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও আদালতের পর্যবেক্ষণ

  • মামলার বিবরণ: শাহীন মালিককে ২০০৯ সালে আক্রমণ করা হয়েছিল। তিনি আদালতে জানান যে তার বিরুদ্ধে আক্রমণের ঘটনা ১৬ বছর আগে ঘটলেও, তার ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি এবং বর্তমানেও মামলাটি দিল্লির রোহিনী আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

  • আদালতের ক্ষোভ: ১৫ বছরের এই দীর্ঘ বিলম্বের কথা শুনে বেঞ্চ চরম হতাশা প্রকাশ করে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, “আইনি ব্যবস্থার কী উপহাস! এটা একটা জাতীয় লজ্জা। যদি জাতীয় রাজধানীই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারে, তাহলে কে করবে?”

  • মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন: আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে অ্যাসিড হামলার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত হওয়া উচিত। এত দীর্ঘ বিলম্ব কেবল আক্রান্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকেই খর্ব করে না, বরং পুরো আইনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকেও দুর্বল করে তোলে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ও পদক্ষেপসমূহ

বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে এবং সারা দেশে এই ধরনের মামলার পরিস্থিতি বোঝার জন্য সুপ্রিম কোর্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছে:

১. হাইকোর্টগুলির কাছে তথ্য তলব: সুপ্রিম কোর্ট দেশের সকল হাইকোর্টকে নির্দেশ দিয়েছে যে, তাদের নিজ নিজ এখতিয়ারভুক্ত এলাকাগুলিতে অ্যাসিড হামলার মামলাগুলির বিচার কতদিন ধরে ঝুলে আছে, তার সম্পূর্ণ তথ্য চার সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে হবে। ২. দ্রুত নিষ্পত্তির আবেদন: শাহীন মালিককে আদালত তার চলমান পিআইএল-এর মধ্যেই একটি আবেদন দাখিল করতে বলেছে, যাতে তার মামলাটির বিচার প্রতিদিন ভিত্তিতে (day-to-day basis) দ্রুত শেষ করা যায়। ৩. কেন্দ্রকে নোটিশ: আদালত কেন্দ্রীয় সরকার এবং ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিভাগ’-কে (Department of Empowerment of Persons with Disabilities) নোটিশ জারি করেছে। ৪. আক্রান্তদের বিশেষ সুবিধা: শাহীন মালিক আদালতে আর্জি জানান যে অ্যাসিড আক্রান্তদের যেন ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি’ (Persons with Disabilities) হিসেবে গণ্য করা হয়, যাতে তারা সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির সুবিধা পেতে পারে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতের এই উদ্বেগ মেনে নেন এবং পরামর্শ দেন যে সরকার এই বিষয়টির ওপর নজর দেবে এবং এই সংক্রান্ত আইন সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করবে।

ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার সমস্যা

আদালত এই সময় আরও উল্লেখ করে যে, অ্যাসিড হামলার শিকার অনেকেই এখনও সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ (Minimum ₹৩ লক্ষ) সম্পূর্ণ পাননি। এছাড়াও, বেসরকারি হাসপাতালগুলি অনেক সময় আক্রান্তদের বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করে, যা আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশনার লঙ্ঘন।

আদালত এই সমস্যা সমাধানে ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটিকে (NALSA) নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা ক্ষতিপূরণ বিতরণের পুরো ডেটা সংগ্রহ করে এবং নিশ্চিত করে যে ব্যক্তিগত হাসপাতালগুলি আক্রান্তদের বিনামূল্যে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করে।

এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট কেবল একটি মামলার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি, বরং দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এবং অ্যাসিড আক্রান্তদের প্রতি সমাজের সংবেদনশীলতার অভাবকে তুলে ধরেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button