বিবাহিত মুসলিম কন্যার পৈতৃক সম্পত্তিতে আইনি অধিকার: জেনে নিন শরিয়ত আইন এবং আদালতের নির্দেশিকা

ভারতে মুসলিম মেয়েদের পৈতৃক বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে অধিকার অন্যান্য ব্যক্তিগত আইন (যেমন হিন্দু আইন) থেকে ভিন্ন। এই অধিকারগুলি মূলত মুসলিম পার্সোনাল ল’ (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ দ্বারা পরিচালিত হয়, যেখানে বংশানুক্রমিক সম্পত্তি (Ancestral Property) এবং স্ব-অর্জিত সম্পত্তির (Self-Acquired Property) মধ্যে কোনো আইনি পার্থক্য করা হয় না। একজন মুসলিমের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত সম্পত্তিই উত্তরাধিকারযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
মুসলিম মেয়েদের মৌলিক অধিকার ও অংশ:
১. জন্মগত অধিকারের অনুপস্থিতি: হিন্দু আইনের বিপরীতে, মুসলিম আইনে সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই পিতার সম্পত্তিতে কোনো অধিকার তৈরি হয় না। সম্পত্তির ওপর অধিকার তৈরি হয় পূর্বপুরুষের মৃত্যুর পর। ২. বিবাহের প্রভাব নেই: একজন মুসলিম কন্যা বিবাহিত হন বা না হন, তাতে তাঁর উত্তরাধিকারের অধিকারে কোনো পরিবর্তন আসে না। কন্যা তার পিতার সম্পত্তির একজন বৈধ এবং অপরিবর্তনীয় উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হন। ৩. সম্পত্তির পরিমাণ (২:১ অনুপাত): মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (সুন্নি হানাফি মতবাদ অনুযায়ী) অনুযায়ী, একজন পুরুষ উত্তরাধিকারীর অংশ একজন নারী উত্তরাধিকারীর দ্বিগুণ হয়। অর্থাৎ, পুত্র এবং কন্যার অনুপাত থাকে ২:১। * যদি কন্যাটির ভাই থাকে, তবে সে অবশিষ্ট উত্তরাধিকারী (Residuary) হিসেবে ভাইয়ের ভাগের অর্ধেক পায়। * যদি কন্যাটি একমাত্র কন্যা হয় এবং কোনো ভাই না থাকে, তবে সে সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) অংশ পায়। * যদি একাধিক কন্যা থাকে এবং কোনো পুত্র না থাকে, তবে তাঁরা সম্মিলিতভাবে সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) অংশ পান। ৪. সম্পত্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ: একজন মুসলিম কন্যা উত্তরাধিকার সূত্রে যে অংশ পান, তিনি সেই সম্পত্তির পরম মালিক হন। তিনি নিজের ইচ্ছামত সেই সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা বা বিক্রয় করতে পারেন।
উইল (Will) সংক্রান্ত নিয়ম:
মুসলিম আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তাঁর মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ (১/৩)-এর বেশি উইল (Wasiyat) করে অন্য কাউকে দিতে পারেন না। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ অবশ্যই শরিয়ত আইন মেনে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়।
সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও আইনি চ্যালেঞ্জ:
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে ঐতিহাসিকভাবে লিঙ্গভেদে সম্পত্তির পরিমাণে যে বৈষম্য রয়েছে (২:১ অনুপাত), তা নিয়ে সাংবিধানিক সমতার (Article 14) ভিত্তিতে আইনি লড়াই জারি আছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় আসেনি, তবে সুপ্রিম কোর্ট বর্তমানে সাফিয়া পিএম বনাম ভারত সরকার মামলায় এই বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। আবেদনকারী দাবি করেছেন যে, যে মুসলিম মহিলারা ব্যক্তিগত আইন মেনে চলতে চান না, তাঁদেরকে যেন ইন্ডিয়ান সাকসেশন অ্যাক্ট, ১৯২৫ অনুযায়ী সাধারণ আইন অনুসারে উত্তরাধিকারের অধিকার দেওয়া হয়, যাতে সম্পত্তির পরিমাণে সাংবিধানিক সমতা নিশ্চিত করা যায়। মুসলিম মেয়েদের সম্পত্তিতে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগীয় নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।



