
ভারতীয় সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে (Article 1) ভারতকে ‘ইউনিয়ন অফ স্টেটস’ বা ‘রাজ্যসমূহের সংঘ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ভারতেও কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন রয়েছে, তবে গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় এই দুটি কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে।
উৎপত্তি ও কাঠামোগত পার্থক্য
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেলিজম বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে উঠেছিল কতগুলো স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্যের মধ্যে ‘চুক্তি’র মাধ্যমে। সেখানে রাজ্যগুলো একত্রিত হয়ে একটি কেন্দ্রীয় শক্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলো কোনো চুক্তির মাধ্যমে একত্রিত হয়নি। ড. বি. আর. আম্বেদকরের মতে, ভারতের ইউনিয়ন কোনো ক্ষণস্থায়ী চুক্তির ফল নয় এবং কোনো রাজ্যেরই এই ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (Secession) অধিকার নেই। ভারতের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য দেশকে রাজ্যগুলোতে ভাগ করা হয়েছে, কিন্তু দেশ অখণ্ড।
ক্ষমতা ও অধিকারের বৈষম্য
১. নাগরিকত্ব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বি-নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) বিদ্যমান—ব্যক্তি একইসাথে তার অঙ্গরাজ্য ও দেশের নাগরিক। কিন্তু ভারতে ‘একক নাগরিকত্ব’ (Single Citizenship) প্রথা চালু। একজন বিহারী বা বাঙালি কেবলই ভারতের নাগরিক।
২. সংবিধানের নমনীয়তা ও কঠোরতা: আমেরিকায় রাজ্যগুলোর নিজস্ব সংবিধান থাকে। ভারতে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদের পর বর্তমানে সমগ্র দেশে একটিই সংবিধান। রাজ্যগুলোর কোনো নিজস্ব সংবিধান নেই।
৩. অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers): আমেরিকায় সংবিধান বহির্ভূত কোনো নতুন ক্ষমতা বা বিষয়ের উদ্ভব হলে তা রাজ্যের হাতে থাকে। কিন্তু ভারতে এই ‘অবশিষ্ট ক্ষমতা’ কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত।
৪. জরুরি অবস্থা: ভারতীয় সংবিধানে ৩৫২, ৩৫৬ ও ৩৬০ নম্বর ধারার মাধ্যমে কেন্দ্র যে কোনো সময় রাজ্যের ক্ষমতা খর্ব করতে পারে বা রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র চাইলেই কোনো নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করতে পারে না।
কেন ‘ফেডারেল’ না বলে ‘ইউনিয়ন’ বলা হয়?
ভারতকে ‘ফেডারেল’ না বলে ‘ইউনিয়ন’ বলার প্রধান কারণ হলো সংহতি। দেশভাগের যন্ত্রণায় জর্জরিত ভারতের সংবিধান প্রণেতারা চেয়েছিলেন একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তি, যা বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতাকে রুখে দিতে পারে।
-
রাজ্যগুলোর অবিচ্ছেদ্যতা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজ্যগুলো অবিনশ্বর (Indestructible Union of Indestructible States), কিন্তু ভারতে কেন্দ্র চাইলে যে কোনো রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন বা অস্তিত্ব বিলোপ করতে পারে (Indestructible Union of Destructible States)।
দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মত
১. ড. বি. আর. আম্বেদকর (Dr. B.R. Ambedkar): তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, “The Draft Constitution is, Federal Constitution in as much as it establishes what may be called a Dual Polity… But the Union is not a League of States, united in a loose relationship, nor are the States the agencies of the Union, deriving powers from it.” তিনি ‘ফেডারেল’ শব্দের বদলে ‘ইউনিয়ন’ ব্যবহারকে ভারতের অখণ্ডতার প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন।
২. গ্র্যানভিল অস্টিন (Granville Austin): বিখ্যাত ব্রিটিশ সংবিধান বিশেষজ্ঞ অস্টিন ভারতীয় কাঠামোকে ‘কো-অপারেটিভ ফেডারেলিজম’ বা ‘সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্র’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, কেন্দ্র ও রাজ্য এখানে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং সহযোগী।
৩. কে. সি. হোয়ার (K.C. Wheare): তিনি ভারতীয় সংবিধানকে ‘কোয়াসি-ফেডারেল’ (Quasi-federal) বা ‘আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয়’ বলেছেন। কারণ ভারতে এককেন্দ্রিক (Unitary) বৈশিষ্ট্যগুলো অত্যন্ত প্রবল।
৪. আইভর জেনিংস (Ivor Jennings): তিনি ভারতকে “Federation with a strong centralising tendency” বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ এমন এক যুক্তরাষ্ট্র যেখানে কেন্দ্রের দিকে ঝোঁক বেশি।
উপসংহার
ভারত ও আমেরিকার ফেডারেলিজমের প্রধান পার্থক্যটি হলো ‘উদ্দেশ্য’। আমেরিকার লক্ষ্য ছিল রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, আর ভারতের লক্ষ্য ছিল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে একটি শক্তিশালী অখণ্ড রাষ্ট্র গঠন করা। এই কারণেই ভারতীয় সংবিধান নমনীয় ও কঠোরতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ, যা প্রয়োজনে এককেন্দ্রিক এবং স্বাভাবিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রীয়।



