আন্ডার-ট্রায়াল বন্দীদের জন্য আর জেল নয়, এবার ‘গৃহবন্দী’র প্রস্তাব: বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মসিহ
৭৩% বিচারপ্রার্থী বন্দীর চাপ কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর 'হোম কাস্টডি' ব্যবহারের আহ্বান

ভারতের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা জেলগুলির অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যা মেটাতে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার প্রক্রিয়াকে আরও সংশোধনমূলক করে তুলতে, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মসিহ একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, নিম্ন-ঝুঁকির অপরাধী এবং বিচারপ্রার্থী বন্দীদের (Under-trial prisoners) জন্য প্রথাগত জেলের বদলে ‘গৃহবন্দী’ (House Arrest) বা ‘হোম কাস্টডি’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর গুরুগ্রামের একটি সেমিনারে (যা পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট দ্বারা আয়োজিত হয়েছিল) সংশোধনমূলক বিচার (Correctional Justice) এবং দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন।
ভারতীয় কারাগারের চরম সংকট
বিচারপতি মসিহ তাঁর প্রস্তাবে ভারতীয় কারাগারের একটি গুরুতর সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন:
-
বিচারপ্রার্থী বন্দীদের ভিড়: ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের কারাগারগুলিতে মোট বন্দীদের প্রায় ৭৩.৫% হলেন বিচারপ্রার্থী (Under-trial)। অর্থাৎ, তারা এখনও দোষী সাব্যস্ত হননি, কিন্তু জামিন না পাওয়ায় তাদের কারাগারে থাকতে হচ্ছে।
-
ভিড়ের কুফল: এই অতিরিক্ত ভিড়ের ফলে কারাগারের পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ হয়। বিচারপ্রার্থী ব্যক্তিরা গুরুতর অপরাধীদের সংস্পর্শে আসে, যা তাদের পুনর্বাসনকে ব্যাহত করে এবং তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। কারাগার তাই ন্যায়বিচার বা সংশোধনের পরিবর্তে দুর্ভোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
প্রস্তাব: প্রযুক্তিনির্ভর গৃহবন্দী
বিচারপতি মসিহ-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব অভিযুক্তরা হত্যা বা অন্যান্য জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত নন এবং যাদের অপরাধের ঝুঁকি কম, তাদের জন্য জেলকে বাধ্যতামূলক না করে বিকল্প পথ খোঁজা উচিত।
তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির (যেমন GPS ট্র্যাকিং বা ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট) মাধ্যমে আদালত নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করে অভিযুক্তদের তাদের বাড়িতেই আটক রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত অনুসরণ
বিশ্বের বহু উন্নত দেশে ইতিমধ্যেই ‘ইলেকট্রনিক সার্ভেইল্যান্স সহ গৃহবন্দী’ ব্যবস্থা চালু আছে। এই দেশগুলিতে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট শর্তে বাড়িতে আটক রাখা হয়, যা কঠোর শাস্তির পরিবর্তে পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনঃএকত্রীকরণ (reintegration)-এর সুযোগ তৈরি করে। ভারতেও এই মডেল অনুসরণ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।
গৃহবন্দীর মাধ্যমে সম্ভাব্য সুবিধা
এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বিচার ব্যবস্থায় বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে:
-
ভিড় নিয়ন্ত্রণ: এটি কারাগারের অতিরিক্ত ভিড় কমাতে সাহায্য করবে, ফলে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান ও নজরদারি নিশ্চিত হবে।
-
সামাজিক বন্ধন বজায়: প্রথমবার অপরাধী বা নিম্ন-ঝুঁকির অভিযুক্তরা জেলে না গিয়ে পরিবার ও সামাজিক পরিবেশে থাকার সুযোগ পাবে, যা তাদের পুনর্বাসনে সহায়ক হবে।
-
অর্থনৈতিক সাশ্রয়: বন্দীদের জেলে রাখা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য সরকারের যে বিপুল ব্যয় হয়, তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
-
সংশোধনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি: প্রথম অপরাধীরা ‘কট্টর অপরাধীদের’ সংস্পর্শে আসা থেকে রক্ষা পাবে, যা বিচার প্রক্রিয়াকে আরও সংশোধনমূলক (rehabilitative) করে তুলবে।
চ্যালেঞ্জ ও সাবধানতা
তবে, এই ব্যবস্থা সফলভাবে কার্যকর করতে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে:
-
নজরদারি নিশ্চিতকরণ: গৃহবন্দী অবস্থায় পর্যাপ্ত ও কার্যকর প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা (যেমন ট্র্যাকিং এবং নিয়মিত পুলিশ চেক) নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অভিযুক্তরা শর্ত লঙ্ঘন না করতে পারে।
-
সঠিক নির্বাচন: কোন অপরাধীদের গৃহবন্দী করা হবে, তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অপরাধের প্রকৃতি এবং অভিযুক্তের ঝুঁকি মূল্যায়ন করে নির্বাচন করতে হবে।
-
জনসচেতনতা: এই বিকল্প পন্থার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সমাজ এবং বিচার ব্যবস্থায় সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে এটিকে শাস্তির বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং অভিযুক্তকে সমাজে হেয় না হতে হয়।
বিচারপতি মসিহ-এর এই প্রস্তাব ভারতের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে আরও মানবিক, আধুনিক এবং সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।



