বৃদ্ধ বাবা-মাকে ভরণপোষণ না দিলে বাতিল হবে সম্পত্তির দানপত্র: যুগান্তকারী রায়ে সুপ্রিম কোর্ট

ভরণপোষণ না দিলে সম্পত্তি ফেরতের অধিকার সুরক্ষিত: উর্মিলার মামলায় ঐতিহাসিক রায়
পরিবার এবং সমাজে প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। এই রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, ‘অভিভাবক ও প্রবীণ নাগরিকদের ভরণপোষণ ও কল্যাণ আইন, ২০০৭’-এর (Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act, 2007) ২৩ ধারা অনুসারে, প্রবীণ নাগরিকরা যদি তাঁদের সন্তানদের ভরণপোষণ বা যত্ন করার শর্তে সম্পত্তি দান করেন এবং পরে সেই শর্ত ভঙ্গ হয়, তবে সেই দানপত্র বা সম্পত্তি হস্তান্তর বাতিল করে সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার অধিকার প্রবীণ নাগরিকদের আছে।
এই রায় দেশের লক্ষ লক্ষ প্রবীণ নাগরিকের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে, যাঁরা জীবনের শেষ লগ্নে এসেও নিজেদের সন্তানদের হাতে বঞ্চনার শিকার হন। বিচারপতি সি.টি. রবিকুমার এবং বিচারপতি সঞ্জয় করোল-এর ডিভিশন বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। এই মামলাটি ‘উর্মিলা দীক্ষিত বনাম সুনীল শরণ দীক্ষিত’ নামে পরিচিত এবং এটি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের একটি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত প্রমাণ করে দিল যে, কোনো আইনকে তার আক্ষরিক অর্থের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে তার উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত, বিশেষ করে যখন তা সমাজের দুর্বল অংশের কল্যাণের জন্য প্রণীত হয়।
ছেলের নামে দান করা সম্পত্তি, বঞ্চনার অভিযোগ ও আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত
মামলার কেন্দ্রে ছিলেন প্রবীণ নাগরিক উর্মিলা দীক্ষিত। তিনি তাঁর কষ্টার্জিত সম্পত্তি নিজের পুত্র সুনীল শরণ দীক্ষিতের নামে একটি ‘দানপত্র’ (Gift Deed)-এর মাধ্যমে হস্তান্তর করেছিলেন। এই হস্তান্তরের মূল ভিত্তি ছিল বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং তাঁর পুত্র তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর দেখভাল করবেন ও প্রয়োজনীয় ভরণপোষণ দেবেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে এই দানপত্রটি সম্পাদিত হয়। যদিও দানপত্রে রক্ষণাবেক্ষণের শর্তটি সরাসরি লেখা ছিল না, তবুও একই সময়ে একটি ‘বচনপত্র’ বা অঙ্গীকারপত্রে (Promissory Note) ছেলেটি স্পষ্টতই অঙ্গীকার করেছিল যে সে তার বাবা-মায়ের দেখাশোনা করবে এবং যদি সে তা না করে, তবে মা উর্মিলা দীক্ষিতের দানপত্রটি ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকবে।
দুর্ভাগ্যবশত, সম্পত্তি হস্তান্তরের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। উর্মিলা দীক্ষিত অভিযোগ করেন যে, তাঁর ছেলে কেবল তাঁর ভরণপোষণ দিতেই ব্যর্থ হননি, বরং উল্টে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং আরও সম্পত্তির জন্য আক্রমণও করা হয়েছিল। পুত্র ও মাতার মধ্যে সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যাওয়ায় প্রবীণ উর্মিলা দীক্ষিত বাধ্য হয়ে ‘অভিভাবক ও প্রবীণ নাগরিকদের ভরণপোষণ ও কল্যাণ আইন, ২০০৭’-এর ২২ ও ২৩ ধারা অনুযায়ী তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে একটি আবেদন করেন। তিনি ওই দানপত্রটি বাতিল করে সম্পত্তিটি তাঁর নিজের নামে ফিরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানান।
ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত থেকে হাইকোর্টের মতভেদ
উর্মিলা দীক্ষিতের আবেদনটি প্রথম গিয়েছিল সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের (এসডিএম) নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল কোর্টে। ট্রাইব্যুনাল প্রবীণ নাগরিকের আবেদনটি মঞ্জুর করে। তারা জানায়, যেহেতু ছেলেটি তার মাকে দেখভাল করার প্রতিশ্রুতি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই দানপত্রটি বাতিল এবং ‘অকার্যকর’ (null and void) বলে গণ্য হবে। ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ছেলে সুনীল শরণ দীক্ষিত প্রথমে কালেক্টর এবং পরে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের সিঙ্গেল জজের কাছে আবেদন করেন। হাইকোর্টের সিঙ্গেল জজও ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে বহাল রাখেন এবং মন্তব্য করেন যে, “ছেলেরা প্রবীণ নাগরিকদের সেবা করতে ব্যর্থ হওয়ায় সঠিক আদালত সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
তবে, আইনি জটিলতা শেষ হয়নি। এরপর মামলাটি হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে যায়। ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গেল জজের রায়কে খারিজ করে দেয়। ডিভিশন বেঞ্চের যুক্তি ছিল যে, এই আইনের ২৩ ধারা অনুসারে ট্রাইব্যুনালের হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা তখনই থাকবে যখন সম্পত্তি হস্তান্তরের মূল দলিলে (যেমন, দানপত্রে) স্পষ্টভাবে ভরণপোষণের শর্তটি লেখা থাকবে। যেহেতু দানপত্রে এমন কোনো সুস্পষ্ট শর্ত ছিল না, তাই ট্রাইব্যুনালের এই দানপত্র বাতিলের কোনো এক্তিয়ার নেই। ডিভিশন বেঞ্চের এই সিদ্ধান্ত প্রবীণ নাগরিক উর্মিলা দীক্ষিতের অধিকারকে সংকটে ফেলে দেয় এবং তাঁকে বাধ্য হয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়।
আইনের উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে উদার ব্যাখ্যা: সুপ্রিম কোর্টের মূল যুক্তি
সুপ্রিম কোর্ট মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে। শীর্ষ আদালত রায় দিতে গিয়ে আইনের ‘উদ্দেশ্যমুখী ব্যাখ্যা’ (Purposive Construction) নীতিটির উপর জোর দেয়। আদালত জানায়, ‘অভিভাবক ও প্রবীণ নাগরিকদের ভরণপোষণ ও কল্যাণ আইন, ২০০৭’ একটি কল্যাণমূলক আইন (Beneficial Legislation)। এমন একটি আইনের ব্যাখ্যা করার সময় তার কঠোর আক্ষরিক অর্থের উপর জোর না দিয়ে, আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য এবং প্রবীণ নাগরিকদের কল্যাণের দিকটিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
বিচারপতিরা পর্যবেক্ষণ করেন যে, এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সহজ, দ্রুত এবং কম খরচে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আদালত জানায়, যখন একজন প্রবীণ নাগরিক তাঁর সম্পত্তির মালিকানা ত্যাগ করে তাঁর সন্তানের নামে হস্তান্তর করেন, তখন সাধারণত প্রত্যাশা করা হয় যে, এর বিনিময়ে তিনি সন্তানের কাছ থেকে সেবা ও যত্ন পাবেন। এই প্রত্যাশাটি কখনও কখনও সুস্পষ্ট শর্ত হিসাবে লেখা নাও থাকতে পারে, কিন্তু এটি একটি অন্তর্নিহিত শর্ত (implied condition) হিসেবে বিদ্যমান থাকে।
এই মামলায়, দানপত্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বচনপত্রটি প্রমাণ করে যে দেখভালের প্রত্যাশা ছিল। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানায় যে, ২৩ ধারার অধীনে কেবল সম্পত্তি হস্তান্তর বাতিল করার ক্ষমতা নয়, প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল প্রবীণ নাগরিককে সম্পত্তির দখল ফিরিয়ে দেওয়ার (Restore Possession) বা উচ্ছেদ (Eviction) করার আদেশও দিতে পারে। যদি ট্রাইব্যুনালের এই ক্ষমতা না থাকত, তবে আইনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতো। কঠোর ব্যাখ্যা প্রয়োগ করলে আইনটি তার লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হবে। আদালত মনে করিয়ে দেয় যে, সন্তানেরা, সে পুত্র হোক বা কন্যা, বাবা-মায়ের দেখভাল করার সামাজিক এবং নৈতিক দায়িত্ব বহন করে। যখন এই দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতা দেখা যায়, তখন আইন প্রবীণ নাগরিকদের পক্ষে দাঁড়াবেই।
দানপত্র বাতিল, মাকে সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ
উপরিউক্ত যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়কে বাতিল ঘোষণা করে। শীর্ষ আদালত উর্মিলা দীক্ষিতের ছেলের নামে সম্পাদিত ২০১৯ সালের সেই দানপত্রটিকে বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা করে। একইসঙ্গে, আদালত দ্রুততার সঙ্গে রায় বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয় এবং নির্দেশ দেয় যে, ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সম্পত্তিটি উর্মিলা দীক্ষিতের দখলে ফিরিয়ে দিতে হবে।
এই রায় ভারতীয় সমাজে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল: বাবা-মায়ের প্রতি সেবা ও যত্ন কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আইন দ্বারা সুরক্ষিত একটি শর্তও। সম্পত্তি হস্তান্তর বা দান করা হলেও, যদি সন্তানরা প্রবীণ বাবা-মায়ের দেখভাল করতে ব্যর্থ হয়, তবে আইন কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করবে। এই ঐতিহাসিক রায় প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী আইনি নজির স্থাপন করল, যা ভবিষ্যতে এই ধরনের অসংখ্য মামলায় প্রবীণ নাগরিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।



