হাইকোর্ট

চেক বাউন্স মামলায় ঐতিহাসিক রায় কেরালা হাইকোর্টের

চেক প্রত্যাখান (Cheque Dishonour) সংক্রান্ত মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি কীভাবে নিজের পক্ষে প্রমাণ পেশ করবেন, সে বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে কেরালা হাইকোর্ট। বিচারপতি বেচু কুরিয়ান থমাস তাঁর রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (NI Act)-এর ১৩৯ ধারার অধীনে আদালত যে আইনি অনুমান তৈরি করে, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে ঋণ না থাকার পরিস্থিতিগত প্রমাণ দেখিয়েও তা সফলভাবে খারিজ করতে পারেন।

আইনের ১৩৯ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি কাউকে চেক দেন এবং তা পরে প্রত্যাখ্যাত হয়, তবে আদালত প্রাথমিকভাবে এটি ধরে নেয় যে চেকটি কোনো বৈধ দেনা (Debt) বা দায়বদ্ধতা মেটানোর জন্য দেওয়া হয়েছিল। তবে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলিকে অনুসরণ করে নিশ্চিত করেছে যে এই আইনি অনুমানটি খণ্ডনযোগ্য (rebuttable)

মামলাটি ছিল এক অভিযুক্তের খালাসের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর করা আপিল। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি ৩,০০,০০০ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন এবং সেই বাবদ একটি চেক দিয়েছিলেন যা ব্যাঙ্কে প্রত্যাখ্যাত হয়।

হাইকোর্টের মূল পর্যবেক্ষণ

আদালত এই বিষয়ে জানায় যে, অভিযুক্তকে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করার জন্য সন্দেহের ঊর্ধ্বে গিয়ে কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। বরং তাঁকে কেবল “সম্ভাবনার প্রাধান্য” (preponderance of probabilities) দিয়ে এটা বোঝাতে হবে যে তাঁর কোনো ঋণ বা দায়বদ্ধতা ছিল না।

বিচারপতি থমাস তাঁর রায়ে বলেন, অভিযুক্ত দুটি প্রধান উপায়ে এই আইনি অনুমান খণ্ডন করতে পারেন:

১. তিনি সরাসরি নিজের তরফে উপযুক্ত প্রতিরক্ষা সাক্ষ্য-প্রমাণ দাখিল করতে পারেন।

২. অথবা, তিনি মামলার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং অভিযোগকারীর নিজের দেওয়া সাক্ষ্য বা স্বীকারোক্তির উপর নির্ভর করে প্রমাণ করতে পারেন যে, ঋণের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

বর্তমান মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি সফলভাবে দ্বিতীয় পদ্ধতিটি অবলম্বন করেন। অভিযুক্ত দাবি করেছিলেন যে তিনি ৩ লক্ষ টাকা ঋণ নেননি, বরং অন্য একটি লেনদেনের জন্য একটি খালি স্বাক্ষরিত চেক দিয়েছিলেন, যা অভিযোগকারী পরে অপব্যবহার করেছেন।

হাইকোর্ট লক্ষ্য করে যে, জেরার সময় অভিযোগকারী নিজেই একটি নথি (Ext. D1) স্বীকার করেছেন, যেখানে দেখা যায় অভিযুক্ত ব্যক্তি আসলে অভিযোগকারীর স্ত্রীর কাছে মাত্র ১,৬৪,০০০ টাকা দিতে বাধ্য ছিলেন। এই স্বীকারোক্তিটি অভিযোগকারীর ৩ লক্ষ টাকার ঋণের মূল দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ছিল। অভিযোগকারীর বক্তব্যেই এমন গুরুতর অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়ায়, আদালত মনে করে যে অভিযুক্তের দেওয়া প্রতিরক্ষার বিষয়টিই বেশি সম্ভাব্য

আদালত এই সিদ্ধান্তে আসে যে, অভিযোগকারীর নিজস্ব সাক্ষ্য-প্রমাণের সামগ্রিক ফল অভিযুক্তের পক্ষেই গিয়েছে। বিচারপতি থমাস তাঁর রায়ে লেখেন, “এই পরিস্থিতিতে, আদালতকে এই বিশ্বাস নিয়ে কাজ করতে হবে যে অভিযোগকারীর দাবি করা ঋণ বা দায়বদ্ধতার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।” এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে হাইকোর্ট ট্রায়াল কোর্টের দেওয়া অভিযুক্তের খালাসের রায় বহাল রাখে।

এই গুরুত্বপূর্ণ রায়টি চেক-প্রত্যাখান মামলায় অভিযুক্তদের জন্য নিজেদের নির্দোষিতা প্রমাণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সহজ পথ তৈরি করে দিল।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button