ভারতে নতুন রাজ্য গঠন এবং বিদ্যমান রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া
Procedure for Formation of New States and Alteration of Boundaries

ভারতীয় সংবিধানের প্রথম অংশ (Part I) এবং বিশেষত ১, ২, ৩ ও ৪ নং ধারায় ভারতের রাজ্যক্ষেত্র (Territory of India) এবং কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যেকার প্রশাসনিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন রাজ্য গঠন, বিদ্যমান রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন বা নাম পরিবর্তন করার ক্ষমতা একচেটিয়াভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের, অর্থাৎ ভারতের সংসদের (Parliament) হাতে ন্যস্ত। এই প্রক্রিয়াটি নিম্নলিখিতভাবে সম্পন্ন হয়:
১. নতুন রাজ্য গঠন ও সীমানা পরিবর্তনের সাংবিধানিক ভিত্তি (Constitutional Basis)
নতুন রাজ্য গঠন এবং বিদ্যমান রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া মূলত সংবিধানের ৩ নং ধারা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
ক. ২ নং ধারা (Admission or Establishment of New States)
এই ধারায় সংসদকে দুটি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে: ১. ইউনিয়নে নতুন রাজ্য ভর্তি করা (Admission): যে রাজ্যগুলি আগে ভারতের অংশ ছিল না, সেগুলিকে ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা (যেমন সিকিম, ১৯৭৫ সালে)। ২. নতুন রাজ্য স্থাপন করা (Establishment): যে ভূখণ্ডগুলি আগে থেকেই ইউনিয়নের অংশ কিন্তু রাজ্য হিসেবে স্বীকৃত ছিল না, সেগুলির সমন্বয়ে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা।
খ. ৩ নং ধারা (Formation of New States and Alteration of Areas, Boundaries or Names of Existing States)
এই ধারা সংসদকে নিম্নলিখিত কাজগুলি করার ক্ষমতা দেয়:
-
নতুন রাজ্য গঠন (Formation): দুটি বা তার বেশি রাজ্যকে একত্রিত করে অথবা কোনো রাজ্যের একটি অংশকে অন্য রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সাথে যুক্ত করে একটি নতুন রাজ্য তৈরি করা।
-
রাজ্যের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি করা (Increase the area): বিদ্যমান কোনো রাজ্যের সীমানা বা ক্ষেত্রফল বাড়ানো।
-
রাজ্যের ক্ষেত্রফল হ্রাস করা (Diminish the area): বিদ্যমান কোনো রাজ্যের ক্ষেত্রফল কমানো।
-
সীমানা পরিবর্তন করা (Alter the boundaries): কোনো রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা পরিবর্তন করা।
-
নাম পরিবর্তন করা (Alter the name): কোনো রাজ্যের নাম পরিবর্তন করা।
২. নতুন রাজ্য গঠনের পদ্ধতি (Procedure for Formation of a New State)
নতুন রাজ্য গঠন বা বিদ্যমান রাজ্যের সীমানা পরিবর্তনের জন্য একটি সাধারণ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, যা সংবিধানের ৩ নং ধারার অধীনে পরিচালিত হয়। এই প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট সরল এবং নমনীয়:
ক. রাষ্ট্রপতির সুপারিশ (Prior Recommendation of the President)
নতুন রাজ্য গঠনের বা সীমানা পরিবর্তনের জন্য বিলটি রাষ্ট্রপতির পূর্ব সুপারিশ ছাড়া সংসদের কোনো কক্ষে পেশ করা যাবে না। এটি হলো এই প্রক্রিয়ার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
খ. রাজ্য আইনসভার অভিমত (Reference to State Legislature for Expressing its Views)
রাষ্ট্রপতি বিলটি সংসদে পেশ করার আগে, সেই বিলটি প্রভাবিত রাজ্যের আইনসভার কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের অভিমত (Views) জানানোর জন্য পাঠান।
-
সময়সীমা: রাষ্ট্রপতি সেই সময়সীমা নির্ধারণ করেন এবং প্রয়োজনে তা বাড়াতেও পারেন।
-
অভিমত বাধ্যতামূলক নয়: রাজ্য আইনসভা যদি সময়মতো কোনো মতামত না দেয়, তবে বিলটি সংসদে পেশ করা যেতে পারে।
-
কেন্দ্রের ক্ষমতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজ্য আইনসভার অভিমত কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ, রাজ্য সম্মতি না দিলেও সংসদ নতুন রাজ্য গঠন করতে বা সীমানা পরিবর্তন করতে পারে। এমনকি বিলটি সংসদে পেশ করার সময়, রাজ্য আইনসভা তাদের মত পরিবর্তন করলেও সংসদ তা গ্রহণ করতে বাধ্য নয়।
গ. সংসদে উত্থাপন ও অনুমোদন (Introduction and Passage in Parliament)
রাষ্ট্রপতি রাজ্যের অভিমত গ্রহণের পরে বা নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর, বিলটি সংসদের যে কোনো কক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (Simple Majority) দ্বারা পাশ করা হয়।
-
সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা: এটি সংবিধান সংশোধনীর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আলাদা। এর অর্থ হলো, বিলটি উপস্থিত এবং ভোটদানকারী সদস্যদের সাধারণ সংখ্যা দিয়ে পাশ করা যায়।
-
রাষ্ট্রপতির সম্মতি: বিলটি সংসদের উভয় কক্ষ দ্বারা পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য যায়। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বিলটি আইনে পরিণত হয় এবং নতুন রাজ্য গঠিত হয়।
৩. বিদ্যমান রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির পদ্ধতি (Procedure for Enhancing Boundaries)
বিদ্যমান রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি করার পদ্ধতিটিও ৩ নং ধারার অধীনেই আসে এবং এটি নতুন রাজ্য গঠনের প্রক্রিয়ার মতোই:
ক. ৩ নং ধারার প্রয়োগ (Application of Article 3)
সীমানা বৃদ্ধি (Increase the area) ৩ নং ধারার অন্তর্ভুক্ত একটি ক্ষমতা। এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির পূর্ব সুপারিশ এবং প্রভাবিত রাজ্য আইনসভার অভিমত আবশ্যক।
খ. সংশ্লিষ্ট রাজ্যের অভিমত (Views of the Affected State)
যদি একটি রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি করা হয়, তবে সেই রাজ্যের আইনসভার কাছে বিলটি পাঠানো হয় মতামত দেওয়ার জন্য। উদাহরণস্বরূপ, যদি ‘ক’ রাজ্যের সীমানা বাড়ানো হয় এবং তার জন্য ‘খ’ রাজ্যের কিছু অংশ কেটে নেওয়া হয়, তবে বিলটি ‘ক’ এবং ‘খ’ উভয় রাজ্যের আইনসভার কাছে পাঠানো হবে।
গ. সাধারণ আইন (Ordinary Legislation)
সীমানা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বিলটিও সংসদের উভয় কক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্বারা পাশ করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি সাংবিধানিক সংশোধনী (Constitutional Amendment) নয়, তাই সংবিধানের ৩৬৮ নং ধারার অধীনে এটি পড়ে না। সংবিধানের ৪ নং ধারায় পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, ২ ও ৩ নং ধারার অধীনে প্রণীত কোনো আইনকে সংবিধান সংশোধন হিসেবে গণ্য করা হবে না।
৪. প্রক্রিয়ার তাৎপর্য (Significance of the Procedure)
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মূল তাৎপর্য হলো:
-
এককেন্দ্রিকতার ঝোঁক (Unitary Bias): নতুন রাজ্য গঠন বা সীমানা পরিবর্তনের ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকা, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে এককেন্দ্রিকতার ঝোঁক ফুটিয়ে তোলে। রাজ্যগুলির সম্মতি বাধ্যতামূলক না হওয়ায়, ভারত ইউনিয়নকে ‘অবিনশ্বর সংযুক্ত রাষ্ট্র, কিন্তু পরিবর্তনশীল রাজ্য’ (Indestructible Union of Destructible States) বলা হয়। অর্থাৎ, কেন্দ্র রাজ্যগুলিকে ভাঙতে বা তাদের সীমানা পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু কোনো রাজ্য কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না।
-
প্রশাসনিক সুবিধা: এই নমনীয় প্রক্রিয়া প্রশাসনিক সুবিধা, ভাষাগত পরিচয় রক্ষা এবং আঞ্চলিক বিকাশের চাহিদা পূরণের জন্য কেন্দ্রকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠন বা বিহার ও মধ্যপ্রদেশের সীমানা পরিবর্তন এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হয়েছিল।



