
দেশের বাণিজ্যিক আইনি ব্যবস্থায় এক তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, কোনো কোম্পানি যদি দেউলিয়া প্রক্রিয়ার (Insolvency Process) মধ্য দিয়ে যায় এবং সেই কারণে কোম্পানির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ব্লক’ বা বন্ধ হয়ে থাকে, তবে সেই সময়ের চেক বাউন্স হওয়াকে ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট’ (NI Act)-এর ১৩৮ নম্বর ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলাটি ছিল ফরহাদ সুরি বনাম প্রবীণ চৌধুরী। অভিযোগকারী দাবি করেছিলেন যে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালকরা দেনা মেটানোর জন্য কিছু চেক প্রদান করেছিলেন। কিন্তু চেকগুলো ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া হলে তা ‘Account Blocked’ বা ‘অ্যাকাউন্ট বন্ধ’ এই মর্মে ফেরত আসে। এরপর পাওনাদাররা আদালতের দ্বারস্থ হন এবং চেক বাউন্সের অপরাধে ডিরেক্টরদের বিরুদ্ধে তিনটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।
বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি প্রতিভা এম সিং এবং বিচারপতি শৈল জৈন-এর বেঞ্চ এই মামলার শুনানি করেন। হাইকোর্ট মামলাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে জানায় যে, চেক বাউন্সের অপরাধের ‘মৌলিক উপাদান’ এখানে অনুপস্থিত। আদালতের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল:
-
নিয়ন্ত্রণের অভাব: যখন কোনো কোম্পানি ইনসলভেন্সি কোড (IBC) অনুযায়ী দেউলিয়া প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে, তখন কোম্পানির ডিরেক্টরদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করার আর কোনো ক্ষমতা থাকে না। সমস্ত ক্ষমতা চলে যায় ইন্টারিম রেজোলিউশন প্রফেশনাল (IRP) বা লিকুইডেটরদের হাতে।
-
আইনের ধারা ১৩৮-এর শর্ত: আদালত বলেছে, ১৩৮ নম্বর ধারা তখনই কার্যকর হয় যখন চেক ইস্যুকারী ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করছেন এবং ফান্ড না থাকা সত্ত্বেও চেক দিয়েছেন। কিন্তু এখানে আইনগত কারণে অ্যাকাউন্টটি আগেই ব্লক করে দেওয়া হয়েছিল।
-
ব্লক হওয়া বনাম অর্থের অভাব: ‘অ্যাকাউন্ট ব্লক’ হওয়া আর ‘ফান্ড অপর্যাপ্ত’ (Insufficient Funds) থাকা এক বিষয় নয়। যেহেতু অ্যাকাউন্ট পরিচালনার আইনি অধিকারই ডিরেক্টরদের কাছে ছিল না, তাই সেই চেকের দায়ভার তাঁদের ওপর চাপানো যায় না।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট মনে করে যে, দেউলিয়া পরিস্থিতির কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে চেক বাউন্স হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করলে তা ন্যায়ের পরিপন্থী হবে। এই যুক্তিতে আদালত ফরহাদ সুরি ও অন্যান্য ডিরেক্টরদের বিরুদ্ধে চলা সমস্ত ফৌজদারি কার্যক্রম এবং আদালতের সমন বাতিল করে দেয়।
রায়ের গুরুত্ব
এই রায়টি শিল্পপতি এবং কোম্পানির পরিচালকদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা দেউলিয়া পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তাঁদের জন্য এটি নিশ্চিত করল যে, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আইনিভাবে বন্ধ হয়ে গেলে চেক বাউন্সের কারণে তাঁদের সরাসরি অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না।



