আইনশিক্ষা

ভরণপোষণ (Maintenance/Alimony): আইন কী বলছে? স্ত্রী ও সন্তানেরা কীভাবে দাবি জানাবে?

আইন অনুযায়ী, স্ত্রী এবং সন্তানেরা যাতে বিবাহবিচ্ছেদ বা আলাদা থাকার পরে আর্থিক সংকটে না পড়েন, তা নিশ্চিত করার জন্য স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ বা মেইনটেন্যান্স দাবি করার অধিকার রাখেন। এটি সামাজিক ন্যায় বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

১. স্ত্রী বা সন্তানেরা কীভাবে স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ দাবি করবেন?

স্ত্রী এবং সন্তানেরা বিভিন্ন আইনের অধীনে স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। এই প্রক্রিয়া সাধারণত দ্রুত এবং সরল প্রকৃতির হয়।

  • ফৌজদারি কার্যবিধি আইন, ১৯৭৩-এর ১২৫ ধারা (Section 125, CrPC): এটি সমস্ত ধর্মের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ বিধান। এটি বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও দ্রুত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করে। যদি কোনো ব্যক্তি পর্যাপ্ত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তার স্ত্রী (যিনি নিজেকে ভরণপোষণ দিতে অক্ষম) বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের (বৈধ বা অবৈধ) ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন, তবে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মাসিক ভাতা প্রদানের নির্দেশ দিতে পারে।
  • হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (Hindu Marriage Act, 1955): এই আইনের ২৪ ও ২৫ ধারা অনুযায়ী বিবাহ সংক্রান্ত মামলা (যেমন বিবাহবিচ্ছেদ) চলাকালীন (Interim Maintenance) বা মামলার শেষে (Permanent Alimony) স্ত্রী ও সন্তানেরা ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
  • ঘরোয়া হিংসা থেকে মহিলাদের সুরক্ষা আইন, ২০০৫ (DV Act): এই আইনের অধীনেও আর্থিক সাহায্যের দাবি জানানো যায়।

দাবি করার প্রক্রিয়া:

  1. আইনজীবীর সাথে পরামর্শ: প্রথমে একজন আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করা আবশ্যক।
  2. আবেদন/পিটিশন দাখিল: পারিবারিক আদালত (Family Court) বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন দাখিল করতে হয়। আবেদনে স্বামীর আয়, জীবনযাত্রার মান, এবং ভরণপোষণের প্রয়োজনীয়তার বিস্তারিত উল্লেখ করতে হয়।
  3. আর্থিক বিবরণী: সুপ্রিম কোর্ট ‘রাজনীশ বনাম নেহা’ (Rajnesh v. Neha, 2020) মামলায় নির্দেশ দিয়েছে যে, উভয় পক্ষকেই তাদের আয়, সম্পত্তি ও দায়বদ্ধতার সম্পূর্ণ আর্থিক বিবরণী হলফনামার মাধ্যমে আদালতে জমা দিতে হবে। এটি ন্যায্য পরিমাণ নির্ধারণে সাহায্য করে।
  4. অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ: মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালত অন্তর্বর্তীকালীন (Interim) ভরণপোষণের নির্দেশ দিতে পারে।

২. যদি স্ত্রী কাজ করেন, তাহলেও কি ভরণপোষণ দিতে হয়?

এই বিষয়টি নিয়ে একাধিক আদালতের রায়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে:

  • পর্যাপ্ত আয় না হলে: স্ত্রী যদি কাজ করেন এবং তার নিজস্ব আয় থাকে, তবুও তিনি ভরণপোষণ পেতে পারেন, যদি সেই আয় তাঁর এবং সন্তানের (যদি থাকে) জীবনযাত্রার মান ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট না হয়। বম্বে হাইকোর্ট একটি সাম্প্রতিক রায়ে (জুন ২০২৫) উল্লেখ করেছে যে, স্বামী এবং স্ত্রীর আয়ের মধ্যে যদি বিরাট পার্থক্য থাকে, তবে স্ত্রী বিবাহপূর্ব জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী।
  • বিলাসিতা নয়, মর্যাদা: সুপ্রিম কোর্ট বারবার বলেছে যে, ভরণপোষণের উদ্দেশ্য স্ত্রী ও শিশুদেরকে আর্থিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা সহকারে বাঁচতে সাহায্য করা, কেবল জীবনধারণ নয়। যদি স্বামীর আয় যথেষ্ট বেশি হয় এবং স্ত্রীর আয় তুলনামূলকভাবে কম হয়, তবে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে স্বামীর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন।
  • আয় গোপন করা গুরুতর অপরাধ: মাদ্রাজ হাইকোর্ট অক্টোবর ২০২৫-এ একটি মামলায় দেখে যে স্ত্রী তাঁর ১ লক্ষ টাকার বেশি মাসিক বেতন গোপন করেছেন। আদালত এটিকে গুরুতর মিথ্যাচার হিসেবে গণ্য করে স্ত্রীর অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, আর্থিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া উচিত এবং আদালতকে ব্যবহার করে স্বামীর কাছ থেকে কেবল অর্থ আদায় করা উচিত নয়।
  • সন্তানদের ক্ষেত্রে: সন্তান যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তবে স্ত্রী কাজ করলেও তার ভরণপোষণের অধিকার সাধারণত বজায় থাকে, কারণ সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উভয় পিতামাতাই সমানভাবে দায়বদ্ধ।

উপসংহার: আদালত প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি, স্বামী-স্ত্রীর আয়, জীবনযাত্রার মান এবং সন্তানের প্রয়োজন বিবেচনা করে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করে। তবে, স্ত্রী বা স্বামী যারই নিজস্ব আয় থাকুক না কেন, কেউ যেন আর্থিক দুর্বলতার কারণে দুর্দশাগ্রস্ত না হন— এটাই আইনের মূল উদ্দেশ্য।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button