
ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, কেবল দীর্ঘকাল ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ বা স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা, নিজে থেকেই বিবাহবিচ্ছেদের বৈধ কারণ হতে পারে না। আদালত এই মন্তব্য করার পাশাপাশি স্বামীর দায়ের করা বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন খারিজ করে দেয়।
মামলার পটভূমি (Background of the Case)
-
বিচ্ছেদের ভিত্তি: স্বামী হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (Hindu Marriage Act, 1955) এর ধারা ১৩(১)(i-a)-এর অধীনে স্ত্রীর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতা (Cruelty)-এর অভিযোগ এনে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন।
-
স্বামীর অভিযোগ: স্বামীর মূল অভিযোগ ছিল—প্রথমত, স্ত্রী দীর্ঘকাল ধরে আলাদা থাকছেন এবং দ্বিতীয়ত, স্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যরা স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারা সহ অন্যান্য ধারায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন, যা স্বামীর প্রতি নিষ্ঠুরতা।
-
নিম্ন আদালতের রায়: নিম্ন আদালতের (Family Court) বিচারক স্বামীর পক্ষে রায় দিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি মঞ্জুর করেছিলেন। এরপর স্ত্রী নিম্ন আদালতের সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন।
ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ (Jharkhand High Court Observations)
বিচারপতি সুজিত নারায়ণ প্রসাদ এবং বিচারপতি কায়সরিয়াল আলমের ডিভিশন বেঞ্চ নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে দেয় এবং স্ত্রীর আপিল মঞ্জুর করে। হাইকোর্ট এই ধরনের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায়গুলি বিবেচনা করে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলি তুলে ধরে:
১. শুধুমাত্র দীর্ঘ বিচ্ছেদ যথেষ্ট নয়: আদালত স্পষ্ট করে যে, যদিও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছেদ রয়েছে, তবুও শুধুমাত্র এই কারণটিই বিবাহবিচ্ছেদের ভিত্তি হতে পারে না, যতক্ষণ না এটি প্রতিষ্ঠিত হয় যে এই বিচ্ছেদ অপর পক্ষের নিষ্ঠুরতার কারণে ঘটেছে। ২. যৌতুক মামলা মানেই নিষ্ঠুরতা নয়: যৌতুক আইন (IPC ধারা ৪৯৮এ)-এর অধীনে স্ত্রী বা তার পরিবারের দ্বারা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে, শুধুমাত্র এই কারণে সেটিকে স্বামীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বলে ধরে নেওয়া যাবে না। ৩. প্রমাণের আবশ্যকতা: আদালত জোর দেয় যে, যদি যৌতুক সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলাটি আদালতে টিকতে না পারে বা স্বামী নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে সেটিকে নিষ্ঠুরতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু মামলাটি দায়ের করার সময়ই, সেটি স্বামীর প্রতি নিষ্ঠুরতা—এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ৪. নিষ্ঠুরতার সংজ্ঞা: হাইকোর্ট ব্যাখ্যা করে যে নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করতে হলে স্বামীকে অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে স্ত্রীর আচরণ বা কাজ এমন প্রকৃতির ছিল যে তা স্বামীর মনে যৌক্তিকভাবে আশঙ্কা তৈরি করেছিল যে স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করা তার জন্য ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক হবে। বর্তমান ক্ষেত্রে স্বামী সেই নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
আইনি ধাপসমূহ (Legal Process Involved)
মামলাটি নিম্নলিখিত আইনি ধাপগুলি অনুসরণ করেছে:
-
ধাপ ১: বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন (Lower Court): স্বামী হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর ধারা ১৩(১)(i-a) এর অধীনে পারিবারিক আদালতে (Family Court) বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেন।
-
ধাপ ২: নিম্ন আদালতের রায়: পারিবারিক আদালত স্বামীর দাবি মেনে নিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি মঞ্জুর করে।
-
ধাপ ৩: হাইকোর্টে আপিল (First Appeal): স্ত্রী নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টে পারিবারিক আদালত আইন, ১৯৮৪-এর ধারা ১৯(১)-এর অধীনে প্রথম আপিল দায়ের করেন।
-
ধাপ ৪: হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়: হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায়কে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে বাতিল করে এবং স্ত্রীর আপিল মঞ্জুর করে। আদালত জানায়, স্বামীর বিরুদ্ধে দায়ের করা ৪৯৮এ মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বামীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নয়।
ফলাফল: হাইকোর্টের রায়ের ফলে স্বামীর বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন খারিজ হয়ে যায় এবং নিম্ন আদালতের ডিক্রিটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় বৈবাহিক সম্পর্কটি পুনরায় আইনিভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে।



