খবরাখবর

ভোটার তালিকা সংশোধনে ‘যথেষ্ট তথ্য নেই’: ECI-কে পূর্ণাঙ্গ আবেদন দাখিলের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

পশ্চিমবঙ্গ সহ একাধিক রাজ্যে SIR শুরুর বিরুদ্ধে PIL, আদালত জানতে চাইল প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা

ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) কর্তৃক পশ্চিমবঙ্গসহ একাধিক রাজ্যে শুরু করা ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, প্রক্রিয়াটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাদের হাতে এখনও পর্যাপ্ত তথ্য নেই এবং ECI-কে অবিলম্বে সমস্ত নথি ও প্রমাণ সহ পূর্ণাঙ্গ আবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলার পটভূমি

২০২৫ সালের ২৪ জুন এবং ২৭ অক্টোবর, ECI ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য SIR প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্য, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ থেকে, রাজনৈতিক দল (যেমন বিজেপি, এআইটিসি, ডিএমকে) এবং নাগরিক সংগঠনগুলি (যেমন এডিআর) সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করে।

  • অভিযোগ: আবেদনকারীদের মূল অভিযোগ ছিল—SIR প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার অভাবে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তড়িঘড়ি শুরু করা হয়েছে। এতে বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে, যা তাদের ভোটাধিকার এবং সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করবে।

  • জরুরি শুনানি: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার ‘তৎক্ষণাৎ শুনানির’ (Urgent Mention) আবেদন করা হয়। আবেদনকারীরা জানান, পশ্চিমবঙ্গে SIR প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, যদিও অনেক নাগরিকের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয় এখনও অমীমাংসিত।

 সুপ্রিম কোর্টের কঠোর পর্যবেক্ষণ

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (CJI)-এর বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করে ECI-এর আইনজীবীকে পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দেন। বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “At this stage, Court has no details”—অর্থাৎ, বর্তমানে আদালতের হাতে SIR-এর বৈধতা, পদ্ধতি, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আবেদনের বর্তমান পরিস্থিতি, ভোটারের অধিকার এবং সংশোধন প্রক্রিয়ার বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই

আদালত ECI-এর আইনজীবীকে নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা:

  • প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদি (যেমন হলফনামা বা ডিক্লারেশন) দ্রুত দাখিল করেন।

  • এরপরই আদালত বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

 ECI-এর প্রাথমিক যুক্তি (সংক্ষেপে)

যদিও ECI-কে এখন পূর্ণাঙ্গ আবেদন জমা দিতে হবে, কমিশন এবং তাদের সমর্থকরা আগে যে যুক্তিগুলি দিয়েছেন, তা হলো:

  • স্বাভাবিক প্রক্রিয়া: ভোটার তালিকা সংশোধন বা পুনরায় যাচাই একটি স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে তালিকা আপ-টু-ডেট না থাকলে SIR অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

  • মিথ্যা অভিযোগ: ‘ভোটার বাদ পড়েছে’ বা ‘গণহারে ভোটাধিকার হরণ হচ্ছে’—এই ধরনের অভিযোগকে ECI “অতিরঞ্জিত” এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

  • উচ্চ অংশগ্রহণ: ECI জানিয়েছে, প্রায় ৯৯.৭৭% বিদ্যমান ভোটারকে গণনা ফর্ম (Enumeration Form) দেওয়া হয়েছে এবং ৭০.১৪% ফর্ম ইতিমধ্যেই ফেরত পাওয়া গেছে, যা প্রক্রিয়ায় জনগণের উচ্চ অংশগ্রহণকে নির্দেশ করে।

  • বিশুদ্ধিকরণ: কমিশনের মতে, SIR-এর উদ্দেশ্য হলো ভুল, ডুপ্লিকেট, মৃত ব্যক্তি বা ভুল ঠিকানার মতো ত্রুটিপূর্ণ এন্ট্রিগুলি সংশোধন করে ভোটার তালিকা বিশুদ্ধ করা, যা নির্বাচনের মান বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।

আইনগত ও রাজনৈতিক গুরুত্ব

সুপ্রিম কোর্টের এই হস্তক্ষেপ প্রমাণ করে যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আদালতের বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। যদি ECI-এর পক্ষ থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং পর্যাপ্ত তথ্য-নথি উপস্থাপন করা না হয়, তাহলে প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বর্তমানে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ফলে ECI-কে তাদের প্রক্রিয়া এবং বৈধতা প্রমাণ করতে হবে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই SIR-এর ভবিষ্যৎ এবং কোটি কোটি ভোটারের অধিকার নির্ভর করছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button