মন্দির তহবিল দেবতার সম্পত্তি, ব্যাঙ্কের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা যাবে না: সুপ্রিম কোর্ট

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি মন্দির তহবিল সংক্রান্ত একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছে, যা মন্দিরের অর্থের ব্যবহার এবং তার সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক স্পষ্ট নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, ভক্তদের দেওয়া এবং মন্দিরের নামে সঞ্চিত অর্থ “দেবতার” সম্পত্তি এবং এই অর্থকে কোনো বেসরকারি বা সমবায়ী ব্যাঙ্কের (Co-operative Bank) বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
মামলার পটভূমি ও হাইকোর্টের নির্দেশ
এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল যখন কেরালার দুটি সমবায়ী ব্যাঙ্ক—মানান্থাভাদি আরবান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড এবং তিরুনেল্লি সার্ভিস কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক লিমিটেড—তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া কেরালা হাইকোর্টের একটি নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
কেরালা হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে, মন্দিরের স্থায়ী আমানত (Fixed Deposit) অবিলম্বে বন্ধ করে পুরো টাকা মন্দির কর্তৃপক্ষকে ফেরত দেওয়া হোক। এই নির্দেশের ফলেই সমবায়ী ব্যাঙ্ক দুটি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে।
ব্যাঙ্কের যুক্তি: সামাজিক প্রভাব ও মেয়াদ
ব্যাঙ্ক-পক্ষ আদালতে যুক্তি পেশ করেছিল যে, তারা বহু বছর ধরে মন্দিরের অর্থ আমানত হিসেবে নিয়েছে এবং সেই অর্থ ব্যাঙ্কের আর্থিক লেনদেনে ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের অনেক আমানতের এখনও মেয়াদ শেষ হয়নি। হঠাৎ করে সমস্ত আমানত বন্ধ করে দিলে তাদের সঙ্গে যুক্ত অনেক সদস্য, বিশেষ করে তফসিলি উপজাতি (Scheduled Tribe) বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলো (Economically Weaker Section) চরম বিপদে পড়বে। ব্যাঙ্কগুলোর দাবি ছিল, কেরালা হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া মন্তব্য
তবে সুপ্রিম কোর্ট সমবায়ী ব্যাঙ্কগুলোর এই যুক্তি মেনে নেয়নি। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী-র সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর মন্তব্য করে।
আদালত স্পষ্ট করে:
“মন্দিরের টাকা দেবতার; এটি কারো বা কারো ব্যাঙ্কের সুবিধা বা প্রয়োজন মেটানোর জন্য ব্যবহৃত হতে পারে না। এই ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে টাকা অরক্ষিত হাতে চলে গেছে, যা ভক্তদের বিশ্বাসের পরিপন্থী।”
আদালতের এই মন্তব্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির অর্থ কেবল তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা উচিত এবং আর্থিক ঝুঁকি বা বাণিজ্যিক লাভের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়।
ব্যাঙ্কের জন্য সময়সীমা
তবে একই সাথে আদালত মানবিক দিক বিবেচনা করে ব্যাঙ্কগুলোকে আমানত ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতি করার জন্য সময় দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট তাদের নির্দেশ কার্যকর করার ওপর তিন মাসের জন্য স্থগিতাদেশ জারি করেছে, যাতে ব্যাঙ্কগুলো ধীরে ধীরে আমানত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে এবং তাদের সদস্যরা হঠাৎ করে আর্থিক সংকটের মুখে না পড়ে।
🔑 এই রায়ের প্রভাব ও গুরুত্ব
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মন্দির তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি পরিষ্কার নির্দেশিকা স্থির করল এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে:
-
তহবিলের উদ্দেশ্য: এই রায় পরিষ্কারভাবে স্থির করলো যে মন্দির তহবিলগুলো শুধুই মন্দির এবং দেবতার জন্য। এই অর্থ শুধুমাত্র পূজা, মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ, দেবশ্রী সংক্রান্ত কাজ, উৎসব, দান-পুণ্য, তীর্থযাত্রা ইত্যাদির জন্য ব্যবহৃত হবে। এর কোনো আর্থিক বা বাণিজ্যিক ব্যবহার করা যাবে না।
-
নিয়ন্ত্রণের সীমা: সমবায়ী ব্যাঙ্ক বা ব্যক্তিগত সংস্থা মন্দির তহবিলকে ব্যাঙ্কিং সুবিধা বা বিভিন্ন ব্যবসায়িক কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারবে না।
-
শক্ত বিরোধী পদক্ষেপ: যারা মন্দির তহবিল অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করতো—সেই পথে এই সিদ্ধান্ত একটি শক্ত পূর্ণ বিরোধী পদক্ষেপ।
-
ভবিষ্যতের নির্দেশিকা: এটি ভবিষ্যতে দেশের সমস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মন্দির-সংস্থাগুলোকে তাদের তহবিল পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেবে।



