আইনশিক্ষা

মানহানি (Defamation): ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩-এর ধারা ৩৫৬

মানহানি কী?

মানহানি (Defamation) হলো এমন কোনো বক্তব্য (লিখিত বা মৌখিক), ইঙ্গিত বা দৃশ্যমান উপস্থাপনা প্রকাশ করা, যা কোনো ব্যক্তির খ্যাতি (Reputation) বা সুনামের ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করে বা ক্ষতি করতে পারে বলে প্রকাশকারী জানেন বা বিশ্বাস করার কারণ আছে।

ভারতীয় আইনে খ্যাতিকে সংবিধানের ২১ নং ধারা (অনুচ্ছেদ ২১) অনুসারে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়, যা মানহানিকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ভিত্তি তৈরি করে।

ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারা ৩৫৬ (BNS, 2023)

মানহানির সংজ্ঞা এবং এর শাস্তি ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩-এর ধারা ৩৫৬-এ বর্ণিত হয়েছে। এটি পূর্ববর্তী ভারতীয় দণ্ডবিধির (Indian Penal Code – IPC) ৪৯৯ ধারা-এর সমতুল্য।

ধারা ৩৫৬(১) অনুসারে, যে ব্যক্তি—

  • কথিত বা পঠিতব্য শব্দ দ্বারা, অথবা

  • ইঙ্গিত দ্বারা, অথবা

  • দৃশ্যমান উপস্থাপনা দ্বারা,

কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমন কোনো অপবাদ (imputation) তৈরি বা প্রকাশ করে যা সেই ব্যক্তির খ্যাতির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে করা হয় বা ক্ষতি করবে বলে সে জানে বা বিশ্বাস করার কারণ আছে, সেই ব্যক্তি মানহানি করেছে বলে ধরা হয়, যদি না তা ধারায় বর্ণিত ব্যতিক্রমগুলোর মধ্যে পড়ে।

অপবাদের ব্যাখ্যা (Explanation of Imputation)

এই ধারায় মানহানির ক্ষেত্রকে প্রসারিত করা হয়েছে:

  1. মৃত ব্যক্তি: মৃত ব্যক্তির সম্পর্কেও এমন অপবাদ মানহানি হতে পারে, যা তিনি জীবিত থাকলে তার খ্যাতির ক্ষতি করত এবং যা তার পরিবারের অনুভূতিতে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

  2. সংস্থা বা সমষ্টি: কোনো কোম্পানি, সমিতি বা কোনো ব্যক্তির সমষ্টিকে উদ্দেশ্য করেও মানহানি হতে পারে।

  3. শ্লেষ বা ব্যঙ্গ: বিকল্প আকারে বা ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রকাশিত অপবাদও মানহানি বলে গণ্য হতে পারে।

  4. ক্ষতি: কোনো অপবাদ তখনই খ্যাতির ক্ষতি করে বলে ধরা হবে, যখন তা অন্যদের চোখে সেই ব্যক্তির নৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্র, তার জাতি বা পেশা-সংক্রান্ত চরিত্র, তার আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করে বা তার শরীরকে ঘৃণ্য বা মর্যাদাহানিকর অবস্থায় ফেলেছে বলে বিশ্বাস সৃষ্টি করে।

প্রধান ব্যতিক্রম (Key Exceptions)

তবে, নিম্নলিখিত দশটি ক্ষেত্রে অপবাদ মানহানি বলে গণ্য হবে না, যার মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:

  1. জনস্বার্থে সত্য কথা: কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যা সত্য তা প্রকাশ করা মানহানি নয়, যদি তা জনস্বার্থের জন্য হয়।

  2. সরকারি কর্মচারীর প্রকাশ্য আচরণ: সরকারি কর্মচারীর জনকার্যের ক্ষেত্রে তার আচরণের উপর সদ্ভাবনামূলকভাবে দেওয়া মতামত মানহানি নয়।

  3. জনসাধারণের কাছে পেশ করা বিষয়: জনসমক্ষে উপস্থাপিত কোনো বিষয় বা কাজের মেধা সম্পর্কে সদ্ভাবনামূলকভাবে দেওয়া মতামত

শাস্তি

ধারা ৩৫৬ (২) ও অন্যান্য উপধারা অনুসারে, মানহানির অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তিকে দুই বছর পর্যন্ত সাধারণ কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত করা যেতে পারে। BNS-এর সংস্কার অনুযায়ী সামাজিক পরিষেবা (Community Service)-এর বিধানও থাকতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

ভারতীয় ফৌজদারি মানহানি আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সুপ্রিম কোর্ট বহু গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে।

  • সুপ্রিম কোর্টের রায়: সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (Subramanian Swamy vs. Union of India, 2016)

    • প্রেক্ষাপট: এই মামলায়, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারার (যা এখন BNS-এর ধারা ৩৫৬) সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।

    • সিদ্ধান্ত: সুপ্রিম কোর্ট ৪৯৯ ও ৫০০ ধারার সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রাখে। আদালত রায় দেয় যে ফৌজদারি মানহানি আইন মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার অধিকারের (অনুচ্ছেদ ১৯(১)(এ)) উপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ (অনুচ্ছেদ ১৯(২))। আদালত আরও বলে যে খ্যাতি বা সুনামের অধিকার হলো অনুচ্ছেদ ২১ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার)-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং এই অধিকার রক্ষা করার জন্য ফৌজদারি মানহানি আইন প্রয়োজনীয়।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিচারপতি এই আইনকে অপরাধমুক্ত (Decriminalise) করার পক্ষে মত দিলেও, সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর মামলার রায় বর্তমানে দেশের মানহানি সংক্রান্ত ফৌজদারি আইনের চূড়ান্ত সাংবিধানিক অবস্থান

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button