
ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে ভারত সরকার ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইনে আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছে। ২০২৪ সালে সংসদে পেশ করা এই ‘ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল’ নিয়ে বর্তমানে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। নিচে সহজ ভাষায় এই দুই আইনের প্রধান তুলনামূলক পার্থক্যগুলো আলোচনা করা হলো।
১. ওয়াকফ বোর্ডের গঠন ও সদস্যপদ
১৯৯৫ সালের আইনে ওয়াকফ বোর্ডের সদস্যদের ক্ষেত্রে মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত ২০২৫-এর সংশোধনীতে বলা হয়েছে, বোর্ডে অমুসলিম সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। এছাড়া বোর্ডে অন্তত দুজন মহিলা সদস্য রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা আগে নির্দিষ্ট ছিল না।
২. কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল এবং জেলা প্রশাসন
পুরানো আইনে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। কিন্তু নতুন বিলে জেলা শাসকের (District Collector) ক্ষমতা অনেক বাড়ানো হয়েছে। কোনো সম্পত্তি ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’ কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা জেলা শাসকের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আগে এই ক্ষমতা মূলত ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের হাতে ছিল।
৩. ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’ (Waqf by User) ধারণা বিলুপ্তি
১৯৯৫ সালের আইনে কোনো সম্পত্তি যদি দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় বা দাতব্য কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসত, তবে তাকে ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’ হিসেবে গণ্য করা হতো (অর্থাৎ কোনো লিখিত দলিল না থাকলেও সেটি ওয়াকফ সম্পত্তি হয়ে যেত)। নতুন সংশোধনীতে এই ধারণাটি বাতিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কোনো সম্পত্তি ওয়াকফ হতে হলে তার যথাযথ আইনি নথি বা ‘ওয়াকফনামা’ থাকা বাধ্যতামূলক।
৪. ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন
পুরানো আইনে ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। অনেক ক্ষেত্রে এর বিরুদ্ধে সাধারণ আদালতে আপিল করা কঠিন ছিল। নতুন সংশোধনীতে ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থায় আরও বেশি স্বচ্ছতা আনবে বলে সরকারের দাবি।
৫. সরকারি জমি এবং ওয়াকফ সম্পত্তি
নতুন বিল অনুযায়ী, যদি কোনো সরকারি জমি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে, তবে জেলা শাসক সেই জমির মালিকানা খতিয়ে দেখবেন। যদি প্রমাণিত হয় যে জমিটি সরকারের, তবে ওয়াকফ বোর্ড সেখান থেকে তাদের দাবি তুলে নিতে বাধ্য থাকবে।
সারসংক্ষেপ: প্রধান পরিবর্তনসমূহ
| বিষয় | ১৯৯৫ সালের আইন | ২০২৫ সালের প্রস্তাবিত সংশোধনী |
| সদস্যপদ | শুধুমাত্র মুসলিম সদস্য। | অমুসলিম সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব। |
| মহিলা প্রতিনিধিত্ব | বাধ্যতামূলক ছিল না। | অন্তত ২ জন মহিলা সদস্য থাকা আবশ্যক। |
| জমির দাবি | বোর্ড নিজেই জমি জরিপ ও দাবি করতে পারত। | জেলা শাসকের তদন্ত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। |
| রেজিস্ট্রেশন | মৌখিক বা ব্যবহারের ভিত্তিতে হতে পারত। | অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ও লিখিত দলিল বাধ্যতামূলক। |
কেন এই পরিবর্তন?
সরকারের মতে, ওয়াকফ সম্পত্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, দুর্নীতি কমানো এবং এই বিশাল ভূ-সম্পত্তিকে আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনতেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধীদের দাবি, এটি ওয়াকফ বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসন কেড়ে নেওয়ার একটি চেষ্টা।



