আইনশিক্ষা

বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানের হেফাজত (Custody) ও ভরণপোষণ: মুসলিম আইন, ‘হিজানত’ নীতি এবং সুপ্রিম কোর্টের ‘শিশুর কল্যাণ’ সংক্রান্ত নির্দেশিকা

ভারতে বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানের হেফাজত বা কাস্টডি সংক্রান্ত আইনগুলি প্রধানত অভিভাবক এবং ওয়ার্ডস আইন, ১৮৯০ (Guardians and Wards Act, 1890) এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইন (যেমন মুসলিম ব্যক্তিগত আইন) দ্বারা পরিচালিত হয়। তবে সব ক্ষেত্রেই আদালতের সর্বোচ্চ বিবেচনা (Paramount Consideration) হলো শিশুর কল্যাণ (Welfare of the Child)

১. মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে সন্তানের হেফাজত (হিযানত/Hizanat):

মুসলিম আইনে হেফাজতকে ‘হিযানত’ (Hizanat) বলা হয়। এই আইন অনুযায়ী, ছোটো বাচ্চাদের দৈনন্দিন যত্ন ও লালন-পালনের অধিকার মূলত মায়ের হাতেই থাকে, কারণ মাকে শিশুর শ্রেষ্ঠ পরিচর্যাকারী মনে করা হয়। তবে, বাবা সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক (Natural Guardian) হিসেবে থাকেন এবং সন্তানের সম্পত্তির দেখভাল করেন।

সন্তানের প্রকার সুন্নি আইন (Hানাফি) অনুযায়ী মায়ের হেফাজত (হিযানত)-এর সময়কাল শিয়া আইন অনুযায়ী মায়ের হেফাজত (হিযানত)-এর সময়কাল
ছেলে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত। ২ বছর বয়স পর্যন্ত।
মেয়ে সাবালকত্ব (Puberty) অর্জন না করা পর্যন্ত (প্রায় ১৫ বছর)। ৭ বছর বয়স পর্যন্ত।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

  • এই সময়কাল শেষ হলে, সাধারণত সন্তানের কাস্টডি বাবার কাছে চলে যায়।

  • তবে, মা যদি বিপথগামী হন, পুনরায় বিবাহ করেন (যদি তা শিশুর কল্যাণের পথে বাধা সৃষ্টি করে) বা অন্য কোনোভাবে অযোগ্য প্রমাণিত হন, তবে আদালত এই অধিকার বাতিল করতে পারে।

  • সন্তানের কাস্টডির অধিকার ভরণপোষণ (Maintenance)-এর অধিকার থেকে আলাদা। বাবা কাস্টডি না পেলেও সন্তানের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

২. সন্তানের কাস্টডি পাওয়ার জন্য বাবা/মাকে যা করতে হবে:

 

কাস্টডি সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বাবা বা মাকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো আদালতে প্রমাণ করতে হয়:

আবশ্যিক পদক্ষেপ বিবেচনার বিষয়বস্তু
শিশুর কল্যাণ নীতি কাস্টডি পাওয়ার প্রধান ভিত্তি হলো “শিশুর কল্যাণই সর্বোচ্চ বিবেচনা” (Welfare of the Child is the Paramount Consideration)। আদালত দেখবে, কোন পরিবেশে শিশুর শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও শিক্ষাগত বিকাশ সবচেয়ে ভালো হবে।
আর্থিক সক্ষমতা শুধুমাত্র বেশি অর্থ উপার্জনই যথেষ্ট নয়। আদালত বিবেচনা করে দেখবে, অভিভাবক একটি স্থিতিশীল এবং নিরাপদ জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করতে সক্ষম কিনা।
নৈতিক ও চারিত্রিক মান অভিভাবকের চরিত্র, নৈতিকতা এবং শিশু লালন-পালনের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত আচরণের পরিপক্কতা বিবেচনা করা হয়।
শিশুর ইচ্ছা (Child’s Preference) যদি শিশু যথেষ্ট পরিণত হয় (সাধারণত ৯ বছর বা তার বেশি), আদালত শিশুর সঙ্গে কথা বলে সে কার কাছে থাকতে চায়, সেই ইচ্ছা বা মতকে গুরুত্ব দেয়।
পারস্পরিক সম্পর্ক সন্তানের সঙ্গে বাবা বা মায়ের বর্তমান সম্পর্ক এবং ঘনিষ্ঠতা বিবেচনা করা হয়।

৩. সুপ্রিম কোর্টের ল্যান্ডমার্ক রায় ও মূলনীতি:

 

কাস্টডি সংক্রান্ত সব ব্যক্তিগত আইনের (মুসলিম আইন সহ) ওপর সুপ্রিম কোর্ট বারবার একটি নীতিকেই প্রতিষ্ঠা করেছে: শিশুর কল্যাণই মুখ্য, ব্যক্তিগত আইন গৌণ

মামলার নাম ও রেফারেন্স মূল সিদ্ধান্ত এবং নীতি
গৌরব নাগপাল বনাম সুমেধা নাগপাল (Gaurav Nagpal v. Sumedha Nagpal, 2009) আদালত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, কাস্টডির মামলার ক্ষেত্রে ‘Welfare’ শব্দটি তার বিস্তৃত অর্থে বিবেচনা করতে হবে। কেবল আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নয়, শিশুর নৈতিক, শারীরিক, মানসিক, ধর্মীয় এবং শিক্ষা সংক্রান্ত কল্যাণই প্রধান।
আশীষ রঞ্জন বনাম অনুপম ট্যান্ডন (Ashish Ranjan v. Anupam Tandon) আদালত জোর দিয়ে বলেছে যে, যেকোনো ব্যক্তিগত আইনে (Personal Law) কাস্টডি সংক্রান্ত বিধান থাকলেও, তা কখনই শিশুর কল্যাণের সর্বোচ্চ নীতির ঊর্ধ্বে যেতে পারে না।
জয়শ্রী বনাম বিকাশ (2022) (নীতিগত রায়) আদালত পুনরায় নিশ্চিত করে যে, শিশু কোনো ‘সম্পত্তি’ (Chattel) নয় যাকে কেবল বাবা-মায়ের আইনি অধিকারের ভিত্তিতে হস্তান্তর করা হবে। স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিকতাই শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার:

সন্তানের কাস্টডি পেতে হলে বাবা বা মা উভয়েরই উচিত আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে আদালতের সামনে প্রমাণ করা যে, তাঁরা অন্য পক্ষের চেয়ে সন্তানের জন্য তুলনামূলকভাবে ভালো এবং স্থিতিশীল পরিবেশ দিতে সক্ষম। এই প্রক্রিয়ায় আইনি অধিকারের চেয়ে শিশুর ভবিষ্যৎ কল্যাণ ও মানসিক স্থিতিশীলতাই আদালতের কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button