আইনশিক্ষা

নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন, ২০১৯ (CAA)-এর অধীনে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম কী?

ভারতের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন, ২০১৯ (CAA) অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম

ভারতে নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন, ২০১৯ (Citizenship Amendment Act, 2019), সংক্ষেপে সিএএ (CAA), হলো ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫-এর একটি সংশোধনী। এই আইনটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর দ্রুত নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যারা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।

এখানে সিএএ-এর অধীনে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম ও আইনি ধাপগুলি সহজ বাংলায় আলোচনা করা হলো।

১. আবেদনের জন্য যোগ্যতার মানদণ্ড (Eligibility Criteria)

সিএএ-এর অধীনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হলে আবেদনকারীকে নিম্নলিখিত সকল শর্ত পূরণ করতে হবে:

শর্ত নং মানদণ্ড বিবরণ
দেশের উৎস আবেদনকারীকে অবশ্যই পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা বাংলাদেশ—এই তিনটি দেশের মধ্যে কোনো একটির নাগরিক হতে হবে।
ধর্মীয় গোষ্ঠী আবেদনকারীকে অবশ্যই নিম্নলিখিত ছয়টি ধর্মীয় গোষ্ঠীর একজন হতে হবে: হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি বা খ্রিস্টান। (মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা এই আইনের অধীনে আবেদন করার যোগ্য নন)।
ভারতে প্রবেশ আবেদনকারীকে অবশ্যই ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে ভারতে প্রবেশ করতে হবে। এর পরে ভারতে প্রবেশকারীরা এই আইনের সুবিধা পাবেন না।
বৈধতার স্থিতি আবেদনকারীকে হয় ভারতে বৈধ নথি ছাড়া প্রবেশকারী হিসেবে গণ্য হতে হবে, অথবা তার বৈধ নথির মেয়াদ শেষ হয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ, তিনি একজন ‘অবৈধ অভিবাসী’ (Illegal Migrant) হিসেবে বিবেচিত হবেন, কিন্তু সিএএ তাঁকে সুরক্ষা দেবে।
আবাসের সময়কাল আবেদনকারীকে ভারতে প্রবেশ করার তারিখ থেকে কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে ভারতে বসবাস করতে হবে (আগের নিয়মে যা ১১ বছর ছিল, সিএএ-এর মাধ্যমে তা কমানো হয়েছে)।

২. আইনি প্রক্রিয়া ও ধাপসমূহ (Legal Procedure and Steps)

যোগ্যতা পূরণ হলে, আবেদনকারীকে ‘স্বীকৃতকরণের মাধ্যমে নাগরিকত্ব’ (Citizenship by Naturalisation) পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে:

ধাপ ১: আবেদন ফর্ম পূরণ (Filling the Application Form)

  • ফর্মের ধরন: আবেদনকারীকে নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫-এর অধীনে, তৃতীয় তফসিলে (Third Schedule) উল্লিখিত বিধান অনুসারে, নাগরিকত্বের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করতে হবে।

  • ফর্ম পূরণের পদ্ধতি: ফর্মটি কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দিষ্ট অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে পূরণ করে জমা দিতে হবে।

ধাপ ২: প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ ও জমা দেওয়া (Collecting and Submitting Documents)

আবেদনের সঙ্গে প্রমাণ হিসেবে নিম্নলিখিত নথিগুলি জমা দিতে হবে:

  • স্বদেশের প্রমাণ: আবেদনকারী যে পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন, তার প্রমাণ।

  • ধর্মীয় প্রমাণ: তিনি যে ছয়টি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর একজন, তার প্রমাণ (যেমন জন্ম শংসাপত্র, শিক্ষাগত শংসাপত্র, বা সরকার অনুমোদিত নথি)।

  • ভারতে প্রবেশের প্রমাণ: ভারতে প্রবেশের তারিখ প্রমাণ করার জন্য পাসপোর্ট, ভিসা, ইমিগ্রেশন সীল, বা সরকার স্বীকৃত অন্য কোনো নথি।

  • আবাসের প্রমাণ: ভারতে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বসবাসের প্রমাণ (যেমন ভাড়া চুক্তি, বিদ্যুৎ বিল, বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের চিঠি)।

  • ধর্মীয় নিপীড়নের ঘোষণা (Declaration): একটি হলফনামা বা ঘোষণা দিতে হবে যে তিনি তার নিজ দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বা সেই নিপীড়নের ভয়ে ভারতে এসেছেন।

ধাপ ৩: শপথ গ্রহণ ও যাচাইকরণ (Oath and Verification)

  • শপথ: আবেদন মঞ্জুর হওয়ার আগে, আবেদনকারীকে অবশ্যই ভারতীয় সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ (Oath of Allegiance) নিতে হবে।

  • যাচাইকরণ: কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের সংস্থাগুলো আবেদনকারীর দ্বারা প্রদত্ত সমস্ত নথি ও তথ্য যাচাই করবে।

ধাপ ৪: নাগরিকত্ব প্রদান (Granting Citizenship)

  • যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এবং যদি সরকার আবেদনকারীকে নাগরিকত্বের জন্য উপযুক্ত মনে করে, তবে কেন্দ্রীয় সরকার তাকে ভারতের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেবে এবং নাগরিকত্বের শংসাপত্র (Certificate of Citizenship) প্রদান করবে।

৩. যে ক্ষেত্রগুলিতে সিএএ প্রযোজ্য নয় (Areas Exempted from CAA)

সিএএ-এর বিধান নিম্নলিখিত দুটি ভৌগোলিক অঞ্চলে প্রযোজ্য হবে না:

  • সংবিধানে ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত অঞ্চল: আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরামের ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত উপজাতীয় অঞ্চলসমূহ।

  • ইনার লাইন পারমিট (ILP) প্রয়োজন এমন অঞ্চল: উত্তর-পূর্ব ভারতের এমন অঞ্চল, যেখানে প্রবেশ করতে ইনার লাইন পারমিট (Inner Line Permit) প্রয়োজন (যেমন অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম)।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button