
বম্বে হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নজিরবিহীন রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো শিশুর হাত যৌন উদ্দেশ্যে ধরা হলে তা পকসো (POCSO) আইনের অধীনে ‘যৌন নিগ্রহ’ বা সেক্সুয়াল অ্যাসাল্ট হিসেবে গণ্য হবে। আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, যৌন নিগ্রহের ক্ষেত্রে শারীরিক স্পর্শের মাত্রা কতটা গভীর ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল সেই স্পর্শের পিছনে অভিযুক্তের উদ্দেশ্য বা ‘ইনটেন্ট’ (Intent) কী ছিল। যদি কোনো ব্যক্তি যৌন কামনা চরিতার্থ করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো শিশুর শরীরে সামান্যতম স্পর্শও করে, তবে তা কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারপতির নাম
এই রায়টি দিয়েছেন বম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি নিবেদিতা পি মেহতা (Justice Nivedita P. Mehta)। তিনি ‘শেখ রফিক শেখ গুলাব বনাম মহারাষ্ট্র সরকার’ (Sheikh Rafique Sk Gulab v. State of Maharashtra) মামলায় এই পর্যবেক্ষণ পেশ করেন। এই মামলায় অভিযুক্ত ২৫ বছর বয়সী এক যুবককে পকসো আইনের ৮ নম্বর ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে নিম্ন আদালতের দেওয়া ৩ বছরের কারাদণ্ডের সাজাই বহাল রেখেছে হাইকোর্ট।
ঘটনার বিবরণ
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে। নির্যাতিতা মেয়েটির বয়স তখন ছিল মাত্র ১৩ বছর। অভিযুক্ত রফিক ছিল মেয়েটির প্রতিবেশী, যাকে সে ‘মামু’ বলে ডাকত। অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি জল খাওয়ার বাহানায় মেয়েটির ঘরে ঢোকে। সে মেয়েটিকে ৫০ টাকার লোভ দেখায় এবং কুপ্রস্তাব দেয়। অভিযুক্ত মেয়েটিকে বলে তাকে ‘গেম’ বা খেলা করতে দিতে, যা আদতে যৌন সম্পর্কের ইঙ্গিত ছিল। এরপর অভিযুক্ত মেয়েটির হাত ধরে। মেয়েটি বিষয়টি বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে তার মামাকে জানায় এবং পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
মামলা চলাকালীন অভিযুক্তের আইনজীবী যুক্তি দেন যে, শুধুমাত্র হাত ধরাকে যৌন নিগ্রহ বলা যায় না এবং ঘটনাটি জনবহুল এলাকায় হওয়ায় তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু বিচারপতি মেহতা এই যুক্তি খারিজ করে দেন। আদালত জানায়, পকসো আইনের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যৌন নিগ্রহের জন্য বলপূর্বক ধস্তাধস্তি বা গুরুতর শারীরিক আঘাতের প্রয়োজন নেই। যৌন লোলুপ দৃষ্টি বা উদ্দেশ্য নিয়ে শিশুর শরীরের যে কোনো অংশে স্পর্শ করা—তা হাত ধরাই হোক না কেন—অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
বিচারপতি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, অভিযুক্তের আচরণ এবং টাকার বিনিময়ে শিশুকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা স্পষ্ট করে দেয় যে তার উদ্দেশ্য ছিল যৌনতা। শিশুর সাক্ষ্যকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ এবং ‘অকাট্য’ বলে মনে করেছে আদালত। বিচারপতির মতে, এই ধরনের অপরাধে শিশুর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তার বয়ানকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব এখানে খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়।
আইনি তাৎপর্য
এই রায়ে আদালত পকসো আইনের ৪২ নম্বর ধারার কথাও উল্লেখ করেছে। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো অপরাধ একই সঙ্গে ভারতীয় দণ্ডবিধি (IPC) এবং পকসো আইন—উভয়ের অধীনেই পড়ে, তবে যে আইনে শাস্তির পরিমাণ বেশি, সেই আইনই প্রযোজ্য হবে। এই ক্ষেত্রে পকসো আইনের ৮ নম্বর ধারায় ন্যূনতম ৩ বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে, যা আইপিসি-র তুলনায় কঠোর। তাই আদালত অভিযুক্তকে পকসো আইনের আওতাতেই সাজা প্রদান করেছে এবং প্রোবেশন অফ অফেন্ডার্স অ্যাক্ট (Probation of Offenders Act)-এর সুবিধা দিতে অস্বীকার করেছে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক, তাই এখানে নমনীয়তার কোনো সুযোগ নেই।
মামলার রায়
sheikh-rafique-sk-gulab-v-state-of-maharashtra-2098834



