ধর্মীয় অবমাননা রুখতে ‘সার্বিক নির্দেশ’ দেওয়া আদালতের কাজ নয়: এলাহাবাদ হাইকোর্ট
হিন্দু দেবদেবীর অবমাননা রোধে জনস্বার্থ মামলা খারিজ, বল গেল সরকারের কোর্টে

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অবমাননা রুখতে আদালতের কাছে ‘সার্বিক বা ঢালাও নির্দেশ’ (Omnibus Order) চেয়েছিলেন আবেদনকারীরা। কিন্তু এলাহাবাদ হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের ঢালাও নিষেধাজ্ঞা জারি করা আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত নয়। এটি মূলত আইনসভা ও প্রশাসনের কাজ।
মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারপতির নাম
গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এলাহাবাদ হাইকোর্টের লখনউ বেঞ্চের বিচারপতি রাজন রায় (Justice Rajan Roy) এবং বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ শুক্লা (Justice Indrajeet Shukla)-র সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। ‘হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিস’ (Hindu Front For Justice) এবং শরদচন্দ্র শ্রীবাস্তবের দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) খারিজ করে এই পর্যবেক্ষণ দেয় আদালত।
আবেদনকারীদের দাবি
মামলাকারীরা দাবি করেছিলেন, হিন্দু দেবদেবী এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ (যেমন— রামচরিতমানস, ভগবদ্গীতা, বাল্মীকি রামায়ণ, মনুস্মৃতি প্রভৃতি) পুড়িয়ে দেওয়া বা সেগুলোর অবমাননা রোধে সরকারকে একটি স্থায়ী ও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হোক। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যতে এ ধরনের অপকর্ম ঘটার আগেই আদালত যেন একটি আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
আদালতের যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ
শুনানি শেষে আদালত জানায়, আবেদনকারীরা যে প্রার্থনা করেছেন তা আইনের ভাষায় ‘জেনারেল ম্যানডামাস’ (General Mandamus)। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ না করে ঢালাওভাবে একটি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। বিচারপতিরা বলেন, কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা কেস ছাড়া আদালত এ ধরনের ‘সুইপিং’ (Sweeping) বা সর্বব্যাপী নির্দেশ জারি করতে পারে না।
আদালত আরও ব্যাখ্যা করে যে: ১. ধর্মীয় অবমাননার বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে ইতিমধ্যেই কঠোর আইনি বিধান রয়েছে। সেই আইনগুলো প্রয়োগ করার দায়িত্ব প্রশাসনের। ২. নতুন কোনো আইন আনা বা বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের কাজ, বিচারালয়ের নয়। ৩. আদালত তখনই হস্তক্ষেপ করে যখন কোনো সুনির্দিষ্ট অধিকার লঙ্ঘিত হয়। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঘটনা আগাম অনুমান করে আদালত কোনো ‘ব্ল্যাঙ্কেট ইনজাংশন’ (Blanket Injunction) বা ঢালাও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে না।
ভবিষ্যতের পথ
হাইকোর্ট আবেদনকারীদের পরামর্শ দিয়েছে যে, তাঁরা যদি সত্যিই ধর্মীয় দেববিগ্রহ বা পবিত্র গ্রন্থ রক্ষার জন্য কঠোর ব্যবস্থা চান, তবে তাঁদের উচিত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সরকারের কাছে আবেদন জানানো। কারণ আইন প্রণয়ন বা প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করার ক্ষমতা সংসদের বা সরকারের হাতে ন্যস্ত।
রায়ের গুরুত্ব
এই রায়ের মাধ্যমে আদালত পুনরায় মনে করিয়ে দিল যে, বিচার বিভাগ, আইনসভা এবং প্রশাসন—এই তিন স্তম্ভের ক্ষমতা পৃথক। কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় বিষয়ে আবেগ থাকলেও, আইনি কাঠামো ছাড়া আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নতুন কোনো স্থায়ী প্রশাসনিক নিয়ম তৈরি করতে পারে না। ধর্মীয় অবমাননা রুখতে বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার ওপরই আদালত আস্থা রেখেছে।



