
ভারতের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। মাদ্রাজ হাইকোর্ট সম্প্রতি এক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, নতুন ফৌজদারি আইনগুলো বলবৎ হওয়ার ফলে দেশে প্রথমবারের মতো এমন এক বিচার প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যা পুরোপুরি ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক (Victim-centric) এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধ।
মামলার প্রেক্ষাপট
বিচারপতি এল. ভিক্টোরিয়া গৌরীর একক বেঞ্চে ‘পুষ্পাবল্লী বনাম শিবগঙ্গাই জেলা পুলিশ সুপার ও অন্যান্য’ শীর্ষক একটি মামলার শুনানি চলাকালীন এই মন্তব্য উঠে আসে। মামলাটি ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে হওয়া একটি খুনের ঘটনার তদন্তে পুলিশের চরম গাফিলতি ও বিলম্ব নিয়ে। ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ করেছিল যে, দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও পুলিশ তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দিচ্ছে না।
নতুন আইনের গুরুত্ব নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ
আদালত উল্লেখ করেছে যে, ঔপনিবেশিক আমলের পুরনো আইন পরিবর্তন করে প্রবর্তিত নতুন তিনটি আইন— ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS) এবং ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম (BSA)— ভারতের দণ্ডবিধিকে ঐতিহাসিকভাবে রূপান্তরিত করেছে।
আদালতের মতে, স্বাধীনতার পর এই প্রথমবার বিচার প্রক্রিয়াকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেয়ে ‘ন্যায়বিচার’ এবং ‘নাগরিক সচেতনতার’ দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়, বরং ভুক্তভোগী বা তার পরিবার যাতে দ্রুত এবং স্বচ্ছভাবে ন্যায় পায়, তা নিশ্চিত করার একটি আইনি কাঠামো।
তদন্তের সময়সীমা ও স্বচ্ছতা
আদালত নতুন আইনের ১৯৩ নম্বর ধারা উল্লেখ করে তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা ও দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে:
-
অহেতুক বিলম্ব রোধ: প্রতিটি তদন্ত কোনো রকম অনাবশ্যক দেরি না করে শেষ করতে হবে।
-
নির্দিষ্ট সময়সীমা: ৭ বছরের কম সাজাযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে ৬০ দিন এবং ৭ বছরের বেশি সাজাযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করা বাধ্যতামূলক।
-
জবাবদিহিতা: যদি কোনো বিশেষ কারণে সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ না হয়, তবে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তার লিখিত কারণ রেকর্ড করতে হবে এবং তা মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে।
আদালতের কড়া নির্দেশ
আলোচ্য খুনের মামলায় (FIR তারিখ: ১১ জানুয়ারি ২০২৪) পুলিশ নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং বিলম্বের কোনো সঠিক কারণও ম্যাজিস্ট্রেটকে জানানো হয়নি। এই প্রেক্ষিতে আদালত নির্দেশ দেয়: ১. আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করতে হবে। ২. তদন্তে দেরি হলে আইনানুযায়ী তার বৈধ কারণ লিখে ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে।
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তদন্তে অনিয়ন্ত্রিত বিলম্ব আসলে “ন্যায়ের বঞ্চনা” বা Denial of Justice-এর সামিল।



