মহিলা কনস্টেবলের অভিযোগ ‘প্রতিশোধমূলক’: সিআইএসএফ অফিসারের বাধ্যতামূলক অবসর বাতিল করল দিল্লি হাইকোর্ট

দিল্লি হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স (CISF)-এর এক বরিষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর আরোপিত শাস্তির আদেশ বাতিল করেছে। প্রায় দুই দশক আগে, এক মহিলা কনস্টেবলের জেন্ডার হ্যারাসমেন্ট বা যৌন হেনস্তার অভিযোগের ভিত্তিতে ওই অফিসারকে ২০০৫ সালে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ (Compulsory Retirement) দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত জানিয়েছে, ওই অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে সাজানো।
ঘটনার সূত্রপাত ও প্রেক্ষাপট
ঘটনাটি শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে, ১৯৯৯ সালে। সেই সময় সিআইএসএফ-এর এক মহিলা কনস্টেবল তার উপরস্থ ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনেন। কনস্টেবলের দাবি ছিল, ওই অফিসার তার সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছেন, কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন এবং একটি অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়।
তদন্ত প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি
মামলাটির নথিপত্র ঘেঁটে আদালত দেখতে পায় যে, এই অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ দায়ের করার পর পর পর দুটি প্রাথমিক তদন্ত (Preliminary Enquiry) চালানো হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উভয় তদন্তেই ওই অফিসারের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তাকে নির্দোষ বলে আখ্যায়িত করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী সেখানেই বিষয়টি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আবারও নতুন করে তদন্ত শুরু করে। অবশেষে, তৃতীয় দফার তদন্তের ওপর ভিত্তি করে ২০০৫ সালে ওই অফিসারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং শাস্তি হিসেবে তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়
দিল্লি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলার শুনানিকালে কড়া পর্যবেক্ষণ প্রদান করে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানায়, প্রথম দুটি তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরেও বারবার তদন্ত চালিয়ে যাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষ ছিল না। বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, ওই মহিলা কনস্টেবলের অভিযোগটি প্রকৃত হেনস্তার ঘটনা নয়, বরং কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা ‘প্রতিশোধ’ (Vengeance) চরিতার্থ করার জন্য করা হয়েছিল।
আদালত আরও বলে, বিভাগীয় তদন্তে বা ডিসিপ্লিনারি প্রসিডিংয়ে প্রমাণের মানদণ্ড ফৌজদারি মামলার মতো কঠোর না হলেও, কাউকে শাস্তি দিতে হলে ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকা আবশ্যক। এই ক্ষেত্রে তা ছিল না। ফলে আদালত ২০০৫ সালের সেই বাধ্যতামূলক অবসরের আদেশটিকে বাতিল বলে ঘোষণা করে।
অফিসারের প্রাপ্য সম্মান ও সুবিধা
হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে ওই সিআইএসএফ কর্মকর্তা তার হারানো সম্মান ফিরে পেয়েছেন। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, ওই অফিসারকে তার চাকরির স্বাভাবিক মেয়াদ (সুপারঅ্যানুয়েশন বা ৬০ বছর বয়স) পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন বলে গণ্য করতে হবে।
যদিও তিনি মাঝখানের বছরগুলোর বকেয়া বেতন (Arrears) পাবেন না, কিন্তু তার পেনশনের হিসাবটি সংশোধন করা হবে। অর্থাৎ, তিনি যদি স্বাভাবিক সময়ে অবসর নিতেন তবে যে পরিমাণ পেনশন পেতেন, এখন থেকে তাকে সেই বর্ধিত হারেই পেনশন প্রদান করা হবে।



