হাইকোর্ট

স্ত্রীকে বাপের বাড়ি থেকে সম্পত্তির ভাগ এনে দিতে চাপও পণের দাবি হতে পারে, ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের

স্ত্রীকে বারবার বাপের বাড়ি থেকে পৈতৃক সম্পত্তির অংশ বা সেই সম্পত্তি বিক্রির টাকা এনে দিতে বাধ্য করা হলে, তা ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩০৪বি ধারার আওতায় পণের দাবি (Dowry Demand) হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, কোনও নারীর পৈতৃক সম্পত্তিতে আইনগত অধিকার থাকলেও, যদি স্বামীর চাপ ও নির্দেশে সেই সম্পত্তির ভাগ বা তার অর্থ আনার জন্য তাঁকে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা পণের দাবির বিস্তৃত অর্থের মধ্যেই পড়বে।

বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিচারপতি অপূর্ব সিনহা রায়ের ডিভিশন বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ করে পণজনিত মৃত্যুর মামলায় স্বামী সাজল পারুইয়ের দোষী সাব্যস্ত হওয়া বহাল রাখে। তবে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কমিয়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রমাণের অভাবে শ্বশুর হরেন্দ্রচন্দ্র পারুই এবং শাশুড়ি রিনা পারুইকে সমস্ত অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে চয়নিকার সঙ্গে সাজল পারুইয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় নগদ টাকা, সোনার গয়না এবং গৃহস্থালির বিভিন্ন সামগ্রী দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান জন্মায়। অভিযোগ, কয়েক বছর পর থেকেই স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে শুরু করেন এবং চয়নিকার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।

প্রসিকিউশনের দাবি, চয়নিকাকে বারবার তাঁর ভাইকে দিয়ে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করিয়ে সেই টাকার অংশ এনে দিতে চাপ দেওয়া হতো। মামলার সাক্ষ্যে উঠে আসে, এর আগেও পরিবারের কিছু জমি বিক্রি হয়েছিল এবং চয়নিকা সেই বিক্রির অর্থের অংশ পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বাকি সম্পত্তিও বিক্রি করে তাঁর অংশ স্বামীর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নিয়মিত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল।

২০১৪ সালের ২৩ জুন চয়নিকা এবং তাঁর অল্পবয়সী মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, চয়নিকা প্রথমে নিজের মেয়েকে হত্যা করেন এবং পরে আত্মহত্যা করেন। এরপর তাঁর ভাইয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ, ৩০২, ৩০৪বি এবং ৩৪ ধারায় মামলা দায়ের হয়। তদন্ত শেষে ৪৯৮এ ও ৩০৪বি ধারার পাশাপাশি পণনিষেধ আইন-এর ৩ ও ৪ ধারায় চার্জশিট জমা দেওয়া হয়।

ট্রায়াল কোর্ট হত্যার অভিযোগ থেকে তিন অভিযুক্তকেই খালাস দিলেও, পণের জন্য নির্যাতন এবং পণজনিত মৃত্যুর অভিযোগে তিনজনকেই দোষী সাব্যস্ত করে। স্বামীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং শ্বশুর-শাশুড়িকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পৃথকভাবে আপিল করা হয়।

হাইকোর্টে স্বামীর অন্যতম যুক্তি ছিল, স্ত্রীকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তির আইনসম্মত অংশ দাবি করতে বলা কখনও পণের দাবি হতে পারে না। কিন্তু আদালত এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। আদালত জানায়, এখানে মূল প্রশ্ন সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার নয়, বরং কোন পরিস্থিতিতে সেই দাবি করা হচ্ছিল।

আদালত পর্যবেক্ষণ করে, একজন নারী তাঁর পৈতৃক সম্পত্তিতে ভাগ চাইতেই পারেন। কিন্তু যদি দেখা যায়, সেই দাবি তাঁর নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং স্বামীর ধারাবাহিক চাপ ও নির্দেশের ফলে করা হচ্ছে, তাহলে সেটি পণের দাবির বিস্তৃত সংজ্ঞার মধ্যে পড়বে। আদালতের মতে, সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে স্পষ্ট যে চয়নিকার উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল যাতে তিনি বাপের বাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করিয়ে সেই অর্থের অংশ স্বামীর হাতে তুলে দেন।

আদালত আরও জানায়, এই ধরনের দাবি সাধারণত পরিবারের গোপন পরিসরেই করা হয়। তাই প্রত্যেক ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীর উপস্থিতি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে স্বাধীন সাক্ষী না থাকলেও, অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য ও পরিস্থিতিগত প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণিত হতে পারে।

তদন্তে উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটও আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। যদিও প্রতিরক্ষা পক্ষ দাবি করেছিল, ওই চিঠিতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, আদালত ভিন্ন মত পোষণ করে। আদালতের মতে, ওই চিঠি থেকেই দাম্পত্য জীবনের অশান্তি এবং অর্থ আনার জন্য চয়নিকার উপর চলা মানসিক চাপের ইঙ্গিত স্পষ্ট। এমনকি সেখানে উল্লেখ ছিল, টাকা জোগাড় না হলে সাজল পারুই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন—এমন এক নীরব হুমকির মধ্যেই চয়নিকাকে থাকতে হচ্ছিল।

তবে শ্বশুর ও শাশুড়ির ক্ষেত্রে আদালত ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। বিচারপতিরা বলেন, এফআইআরে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও বিচার চলাকালীন কোনও শক্তিশালী বা নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য উপস্থাপন করা যায়নি। অভিযোগকারী তথা মৃতার ভাইও আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ করেননি। অন্য সাক্ষীরাও প্রমাণ করতে পারেননি যে শ্বশুর-শাশুড়ি সক্রিয়ভাবে পণের দাবি বা নির্যাতনে অংশ নিয়েছিলেন। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণিত হয়নি এবং সন্দেহের সুবিধা দিয়ে তাঁদের খালাস দেওয়া হয়।

স্বামীর বিরুদ্ধে আদালত ভারতীয় সাক্ষ্য আইন-এর ১১৩বি ধারা অনুযায়ী আইনি অনুমানের (Statutory Presumption) প্রয়োগও বহাল রাখে। আদালত জানায়, একবার পণজনিত মৃত্যুর প্রাথমিক উপাদান প্রমাণিত হলে আইনের এই অনুমান স্বামীর বিরুদ্ধে কার্যকর হয় এবং তা খণ্ডনের দায় অভিযুক্তের উপর বর্তায়।

তবে সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের Hari Om বনাম State of Haryana মামলার রায়ের উল্লেখ করে জানায়, ৩০৪বি ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রতিটি ক্ষেত্রে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী ও বিরল পরিস্থিতিতেই সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া উচিত।

এই মামলাকে সেই ধরনের বিরল ঘটনা হিসেবে না দেখে আদালত স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কমিয়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। তবে ট্রায়াল কোর্টের আরোপিত জরিমানা বহাল রাখা হয়েছে।

ফলে হাইকোর্ট আংশিকভাবে আপিল মঞ্জুর করে। স্বামী সাজল পারুইয়ের দোষী সাব্যস্ত হওয়া বহাল থাকলেও তাঁর সাজা কমানো হয়েছে। অন্যদিকে, শ্বশুর হরেন্দ্রচন্দ্র পারুই এবং শাশুড়ি রিনা পারুইকে প্রমাণের অভাবে সমস্ত অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button