হাইকোর্ট

বৈধ বিয়ের কঠোর প্রমাণ না থাকলেও ভরণপোষণের দাবি খারিজ করা যায় না: এলাহাবাদ হাইকোর্ট

এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাস এবং তাঁদের সন্তানের জন্মের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হলে, শুধুমাত্র বৈধ বিয়ের কঠোর প্রমাণের অভাব দেখিয়ে কোনও মহিলার ভরণপোষণের আবেদন খারিজ করা উচিত নয়। আদালত বলেছে, ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১২৫ ধারার মূল উদ্দেশ্য হলো আর্থিকভাবে অসহায় নারী ও সন্তানকে সুরক্ষা দেওয়া। তাই এই বিধানের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অতিরিক্ত কারিগরি বা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত নয়।

বিচারপতি অচল সচদেব একটি ফৌজদারি পুনর্বিবেচনা (ক্রিমিনাল রিভিশন) মামলার শুনানিতে এই মন্তব্য করেন। তিনি মহারাজগঞ্জের পারিবারিক আদালতের একটি আদেশ আংশিকভাবে বাতিল করে মামলাটি নতুন করে শুনানির জন্য ফেরত পাঠিয়েছেন।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারী মহিলা ২০১৯ সালে সিআরপিসির ১২৫ ধারায় নিজের জন্য মাসে ২৫ হাজার টাকা এবং তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জন্য ১৫ হাজার টাকা ভরণপোষণ চেয়ে আবেদন করেন। তাঁর দাবি, ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি বিবাদীর সঙ্গে কোর্ট ম্যারেজের জন্য আবেদন করেছিলেন। এরপর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা একটি চার চাকার গাড়ির দাবিতে তাঁকে পণের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে শুরু করেন। ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর তাঁকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

পরে গ্রামের প্রবীণদের হস্তক্ষেপে তিনি স্বামীর সঙ্গে গোরখপুরে তাঁর সরকারি কোয়ার্টারে থাকতে শুরু করেন। সেখানে তাঁদের একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। তবে তাঁর অভিযোগ, নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ তাঁকে আটকে রেখে মারধর করা হয়, তাঁর স্ত্রীধন কেড়ে নেওয়া হয় এবং আবার বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি নিজের সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের বাড়িতে বসবাস করছেন। তাঁর কোনও স্বাধীন আয়ের উৎস নেই বলেও তিনি আদালতকে জানান। অন্যদিকে, স্বামী একটি ডিগ্রি কলেজে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত এবং কৃষিজমি থেকেও আয় করেন বলে দাবি করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ মার্চ মহারাজগঞ্জের পারিবারিক আদালত মহিলার ভরণপোষণের আবেদন খারিজ করে। আদালতের মতে, তিনি বিবাদীর আইনগত স্ত্রী হওয়ার প্রমাণ দিতে পারেননি। তবে তাঁদের সন্তানকে বিবাদীর অবৈধ সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে তার জন্য মাসে ৫ হাজার টাকা ভরণপোষণ মঞ্জুর করা হয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান আবেদনকারী।

হাইকোর্ট দেখতে পায়, পারিবারিক আদালত শুধুমাত্র বিয়ের নোটিশের ফটোকপি জমা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে মহিলার দাবি খারিজ করেছে। কিন্তু বিবাদী নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি কোর্ট ম্যারেজের জন্য আবেদন করেছিলেন, আবেদনকারীর সঙ্গে সরকারি কোয়ার্টারে একসঙ্গে বসবাস করেছেন এবং তাঁদের একটি সন্তান রয়েছে।

আদালত মন্তব্য করে, পারিবারিক আদালত সহবাসের বিষয়টি এবং সন্তানের জন্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। এমনকি সন্তানের জন্মসনদের মতো নথিও উপেক্ষা করা হয়েছে। বিচারপতি বলেন, এভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা আদালতের পক্ষ থেকে যথাযথভাবে বিচারবিবেচনা না করারই প্রমাণ।

হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের Badshah v. Urmila Badshah Godse (২০১৪) মামলার রায়ের ওপর নির্ভর করে জানায়, একজন নারী ও একজন পুরুষ যদি দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে বসবাস করেন এবং সেই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ভরণপোষণের দাবির ক্ষেত্রে বৈধ বিয়ের কঠোর প্রমাণের ওপর জোর দেওয়া উচিত নয়। এতে আইনের কল্যাণমূলক উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

এছাড়া আদালত জানায়, Rajnesh v. Neha (২০২১) মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী উভয় পক্ষের সম্পদ, আয় ও দায়-দায়িত্বের হলফনামা জমা নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু পারিবারিক আদালত সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা থেকে বিচ্যুতি।

সব দিক বিবেচনা করে হাইকোর্ট সন্তানের জন্য মাসে ৫ হাজার টাকা ভরণপোষণের আদেশ বহাল রাখে। একই সঙ্গে মহিলার ভরণপোষণের আবেদন খারিজের আদেশ বাতিল করে মামলাটি নতুন করে শুনানির জন্য মহারাজগঞ্জের পারিবারিক আদালতে পাঠায়। আদালত নির্দেশ দেয়, উভয় পক্ষ নির্ধারিত ফরম্যাটে আয়, সম্পদ ও দায়-দায়িত্বের হলফনামা দাখিল করবেন এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি, সম্ভব হলে তিন মাসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করার নির্দেশও দেয় হাইকোর্ট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button