চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারকে ₹৮ লক্ষ ক্ষতিপূরণ
রেল ক্লেমস ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল করল কলকাতা হাইকোর্ট

চলন্ত লোকাল ট্রেন থেকে পড়ে এক যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত রেল ক্লেমস ট্রাইব্যুনালের (Railway Claims Tribunal) আগের রায় বাতিল করে জানিয়েছে, পুলিশের তদন্তে মৃতের কাছ থেকে রেলের টিকিট উদ্ধার হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তিনি একজন বৈধ যাত্রী (Bona Fide Passenger) ছিলেন এবং ঘটনাটি রেলওয়ে আইনের অধীনে একটি “অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা” (Untoward Incident) হিসেবে গণ্য হবে। তাই মৃতের পরিবার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী। গত ৩০ জুন বিচারপতি বিশ্বরূপ চৌধুরী এই রায় দেন।
মামলার পটভূমি
রুম্পা মল্লিক ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে রেল ক্লেমস ট্রাইব্যুনালের ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ সালের রায়ের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করা হয়। ট্রাইব্যুনাল তাদের ক্ষতিপূরণের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল।
আবেদনকারীদের দাবি, ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর মৃত ব্যক্তি বৈদ্যবাটি থেকে বেলুড়ে কাজের উদ্দেশ্যে একটি রিটার্ন টিকিট কেটে যাত্রা করেছিলেন। কাজ শেষ করে তিনি বাড়ি ফেরার জন্য একটি ব্যান্ডেল লোকাল ট্রেনে ওঠেন। রিষড়া ও শ্রীরামপুর স্টেশনের মাঝামাঝি চলন্ত ট্রেন থেকে তিনি দুর্ঘটনাবশত পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পরে পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং মৃতের পকেট থেকে একটি রেলের টিকিট উদ্ধার করে বলে তদন্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, রেল কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তাদের নিজস্ব তদন্তে মৃতের কাছ থেকে কোনো টিকিট পাওয়া যায়নি। এছাড়া আবেদনকারীদের পেশ করা জব্দ তালিকার (Seizure List) সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে রেল।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি বিশ্বরূপ চৌধুরী বলেন, রেল দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের মামলাগুলি বিচার করার সময় বাস্তব পরিস্থিতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, কোনো যাত্রী একা ভ্রমণ করলে দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।
আদালত Union of India v. Rina Devi মামলায় সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়ের উল্লেখ করে জানায়, মৃত বা আহত ব্যক্তির দেহে টিকিট না পাওয়া গেলেই তিনি অবৈধ যাত্রী ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
হাইকোর্ট জানায়, আবেদনকারীরা যদি হলফনামা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের মাধ্যমে দেখাতে পারেন যে মৃত ব্যক্তি ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন, তাহলে সেই দাবি খণ্ডনের দায় রেল কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।
আদালত সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে জানায়, “শুধুমাত্র টিকিট না পাওয়া গেলেই একজন যাত্রী বৈধ যাত্রী ছিলেন না—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।”
এছাড়া কর্ণাটক হাইকোর্টের একটি রায়েরও উল্লেখ করে আদালত বলে, একা ভ্রমণকারী যাত্রীর দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষে প্রত্যক্ষদর্শী হাজির করা প্রায় অসম্ভব।
পুলিশের তদন্তকে বেশি গুরুত্ব
মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পায়, ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১৭৪ ধারায় প্রস্তুত করা পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে মৃতের দেহ থেকে একটি রেলের টিকিট উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই জব্দ তালিকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির টিপসইও ছিল।
রেলওয়ের এক আরপিএফ (RPF) কর্মী আদালতে দাবি করেছিলেন, তিনি একটি ফাঁকা জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু আদালত তার সাক্ষ্যে একাধিক অসঙ্গতি খুঁজে পায় এবং সেই বক্তব্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।
আদালত আরও উল্লেখ করে, যে তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিক সরকারি নথিতে টিকিট উদ্ধারের কথা লিখেছেন, তাকে সাক্ষ্য দিতে ডেকে রেল কর্তৃপক্ষ সেই নথি চ্যালেঞ্জ করেনি। ফলে তদন্ত প্রতিবেদন ও জব্দ তালিকাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই।
আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ
সব তথ্য ও প্রমাণ বিচার করে কলকাতা হাইকোর্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে মৃত ব্যক্তি বৈধ টিকিট কেটে ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন এবং চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে তার মৃত্যু হওয়ায় এটি রেলওয়ে আইনের অধীনে একটি “Untoward Incident”।
ফলে আদালত রেল ক্লেমস ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল করে দেয় এবং কেন্দ্রীয় সরকার তথা ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়াকে মৃতের পরিবারকে ₹৮ লক্ষ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এছাড়া, ক্ষতিপূরণের আবেদনের তারিখ থেকে অর্থ প্রদান না হওয়া পর্যন্ত বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত আরও জানায়, এই অর্থ আট সপ্তাহের মধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে জমা দিতে হবে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর আবেদনকারীরা সেই অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।
কোর্ট অর্ডারrumpa_mallick_ors_v_union_of_india_fma_1315_of_2025_



