মহুয়া মৈত্রকে অন্তর্বর্তী স্বস্তি, আপাতত গ্রেপ্তারি বা কড়া পদক্ষেপে স্থগিতাদেশ
তদন্তে সহযোগিতার শর্তে অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশকে কড়া ব্যবস্থা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ

কলকাতা হাইকোর্ট তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)-র সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে ঘিরে দায়ের হওয়া একটি ফৌজদারি মামলায় অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের জোরপূর্বক বা কড়া পদক্ষেপ (Coercive Action) নেওয়া যাবে না। তবে এই সুরক্ষা পাওয়ার শর্ত হিসেবে আদালত স্পষ্ট করেছে, মহুয়া মৈত্রকে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য এই অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেন। তিনি মহুয়া মৈত্রের দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানি করছিলেন, যেখানে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল (Quashing) এবং বারবার পুলিশি নোটিস জারি বন্ধের আবেদন জানান।
মামলার পটভূমি
মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি ভিডিওতে এমন মন্তব্য করেছেন যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, কৃষ্ণনগরের একটি আদালতের বাইরে একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা ডিম ও টমেটো নিয়ে জড়ো হওয়ার ঘটনার পর ওই ভিডিওগুলি প্রকাশ করা হয়। সেই ভিডিওগুলিতে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়।
মহুয়া মৈত্রের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য আদালতে যুক্তি দেন, তাঁর মক্কেলের কোনো বক্তব্যেই হিন্দু বা মুসলিম সম্প্রদায়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, যেসব ধারায় মামলা করা হয়েছে, সেগুলিতে সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কম। ফলে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)-এ এমন মামলায় যে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, মহুয়া মৈত্রও তার সুবিধা পাওয়ার অধিকারী।
আইনজীবী আরও জানান, মহুয়া মৈত্র বর্তমানে সংসদের চলমান বর্ষাকালীন অধিবেশনে (Monsoon Session) অংশগ্রহণ করছেন। তাই সেই সময়ে তিনি পুলিশি নোটিসে সাড়া দিতে পারেননি। এই পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই তদন্তকারী সংস্থা একের পর এক নোটিস পাঠিয়েছে।
অন্যদিকে, রাজ্যের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র আদালতে বলেন, তদন্তকারী সংস্থা একাধিকবার নোটিস পাঠালেও মহুয়া মৈত্র হাজির হননি। তিনি যুক্তি দেন, তদন্ত আইন অনুযায়ী চলতে পারে এবং তদন্তে সহযোগিতা করা আবেদনকারীর দায়িত্ব। তিনি বারবার হাজিরা এড়িয়ে যেতে পারেন না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
শুনানির সময় বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য প্রথমে মহুয়া মৈত্রের তদন্তে সহযোগিতা না করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে একই সঙ্গে আদালত লক্ষ্য করে যে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলিতে সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের কম।
আদালত আরও বিবেচনা করে যে, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন চলায় মহুয়া মৈত্র ১৩ আগস্ট পর্যন্ত সংসদীয় কাজে ব্যস্ত থাকবেন। তাই আদালত নির্দেশ দেয়, তাঁকে নতুন করে কোনো নোটিস না পাঠিয়ে ১৪ আগস্ট বিকেল ৩টায় তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে হাজির হতে হবে।
আদালত তার নির্দেশে স্পষ্ট জানায়, নির্ধারিত শর্তগুলি মেনে চললে ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো জোরপূর্বক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
এছাড়াও আদালত পুলিশকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেয়, তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় মহুয়া মৈত্র যেন ডিম নিক্ষেপ বা এ ধরনের কোনো হয়রানির শিকার না হন, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
আদালতের সিদ্ধান্ত
সব দিক বিবেচনা করে কলকাতা হাইকোর্ট তদন্তকারী সংস্থাকে আইন অনুযায়ী তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তবে তদন্ত চলাকালীন মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে ৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত অথবা আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো কড়া বা জোরপূর্বক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
আদালত আরও জানিয়েছে, এই অন্তর্বর্তী সুরক্ষা কেবল তখনই বহাল থাকবে, যদি মহুয়া মৈত্র তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেন এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে হাজির হন।
পাশাপাশি আদালত রাজ্য সরকারকে স্বাধীনতা দিয়েছে যে, যদি আবেদনকারী আদালতের নির্দেশ অমান্য করেন বা তদন্তে সহযোগিতা না করেন, তাহলে রাজ্য পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবে।
মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ১ অক্টোবর ২০২৬।
কেস টাইটেল: Mahua Moitra vs State of West Bengal and Others
কেস নম্বর: WPA/15399/2026



