বেসরকারি চাকরিজীবী অভিভাবকের বেতনও নন-ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণে গণ্য: কেরল হাইকোর্ট
শুধু বেতন বাদ দিলে সংরক্ষণের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, জানাল আদালত

কেরল হাইকোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়েছে, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি) সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নন-ক্রিমি লেয়ার (এনসিএল) মর্যাদা নির্ধারণের সময় বেসরকারি খাতে কর্মরত অভিভাবকের বেতন উপেক্ষা করা যাবে না। আদালতের মতে, বেতনকে সম্পূর্ণভাবে হিসাবের বাইরে রাখলে সংরক্ষণ ব্যবস্থার সাংবিধানিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং প্রকৃতভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের পরিবর্তে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারও সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে যাবে।
বিচারপতি বেচু কুরিয়ান থমাস নিট-ইউজি ২০২৬ এবং কিইএএম ২০২৬-এ ভর্তির জন্য নন-ক্রিমি লেয়ার শংসাপত্র চেয়ে দায়ের হওয়া দুটি রিট আবেদন খারিজ করে এই রায় দেন। আদালত বলেন, আবেদনকারী দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের আয় ও সম্পদ সরকার নির্ধারিত সীমার অনেক বেশি। ফলে তারা নন-ক্রিমি লেয়ারের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন।
মামলার একজন আবেদনকারী নমন অজয়। তিনি নিট-ইউজি ২০২৬-এ ভর্তির জন্য নন-ক্রিমি লেয়ার শংসাপত্র চেয়েছিলেন। তাঁর বাবা যুক্তরাজ্যে বার্কলেজ ইউকে কনজিউমার ব্যাংকে লিড সলিউশন আর্কিটেক্ট হিসেবে কর্মরত এবং বছরে প্রায় ৩৩ লক্ষ টাকা বেতন পান।
অন্য আবেদনকারী কার্তিকা শিবাজি কিইএএম ২০২৬-এ ভর্তির জন্য একই ধরনের শংসাপত্রের আবেদন করেন। তাঁর বাবা একটি বেসরকারি সংস্থার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাঁর বার্ষিক বেতন ১.১২ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া তাঁর একাধিক মূল্যবান সম্পত্তিও রয়েছে।
দুই আবেদনকারীরই দাবি ছিল, তাঁদের অভিভাবকদের বেতন ছাড়া অন্য উৎস থেকে আয় সরকার নির্ধারিত সীমার নিচে। তাই তাঁদের নন-ক্রিমি লেয়ার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই যুক্তির পক্ষে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের Union of India v. Rohith Nathan (2026) মামলার রায়ের উপর নির্ভর করেন।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকার আদালতে জানায়, যদি বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সম্পূর্ণভাবে হিসাবের বাইরে রাখা হয়, তাহলে আর্থিকভাবে অত্যন্ত সচ্ছল পরিবারও সংরক্ষণের সুবিধা পাবে। যা ক্রিমি লেয়ার নীতির মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
বিচারপতি বেচু কুরিয়ান থমাস তাঁর রায়ে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ইন্দ্রা সাহনি মামলার রায়ের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হল সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের উন্নয়নের সুযোগ করে দেওয়া। আর্থিকভাবে উন্নত ও সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষদের এই সুবিধা দেওয়া সংবিধানের উদ্দেশ্য নয়।
আদালত নন-ক্রিমি লেয়ার সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকার ব্যাখ্যাও করেন। সেখানে বলা হয়েছে, বেতন এবং কৃষিজমি থেকে আয় একত্রে যোগ করা হবে না। আদালত স্পষ্ট করে জানায়, এর অর্থ এই নয় যে বেতন সম্পূর্ণভাবে বাদ দিতে হবে। বরং এর উদ্দেশ্য হল বেতন ও কৃষিজ আয়কে একত্রে গণনা না করা।
আদালত আরও মন্তব্য করে, যদি বেতনকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়, তাহলে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। অনেক উচ্চ আয়ের পরিবার শুধু অন্য উৎস থেকে কম আয় দেখিয়ে নন-ক্রিমি লেয়ারের সুবিধা দাবি করতে পারবে, যা সংরক্ষণ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্যকে ব্যর্থ করবে।
সুপ্রিম কোর্টের Union of India v. Rohith Nathan (2026) মামলার প্রসঙ্গেও কেরল হাইকোর্ট স্পষ্ট করে জানায়, ওই রায়ে কোথাও বলা হয়নি যে বেতনকে সম্পূর্ণভাবে আয়ের হিসাব থেকে বাদ দিতে হবে। বরং সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, ক্রিমি লেয়ার বাদ দেওয়া একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, যাতে সংরক্ষণের সুবিধা প্রকৃতভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছেই পৌঁছায়।
বর্তমান মামলায় আদালত লক্ষ্য করে, এক আবেদনকারীর বাবার বার্ষিক আয় ১.১২ কোটিরও বেশি এবং তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট ও বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। অন্য আবেদনকারীর বাবাও বিদেশে বহুজাতিক ব্যাংকে কর্মরত এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেতন পান। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের নন-ক্রিমি লেয়ার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে আদালত মত দেয়।
সব দিক বিবেচনা করে কেরল হাইকোর্ট দুই আবেদনই খারিজ করে দেয় এবং নন-ক্রিমি লেয়ার শংসাপত্র না দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
কেস টাইটেল: Naman Ajay v. Union of India & Others এবং Karthika Sivaji (Minor) v. State of Kerala & Others


