খবরাখবর

আই-প্যাক তল্লাশিতে বাধার অভিযোগে ইডির মামলায় সুপ্রিম কোর্টে তুমুল শুনানি

মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, সিবিআই তদন্তের দাবিতে ইডির জোরালো সওয়াল

কলকাতায় রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা I-PAC-এর অফিসে তল্লাশি চালানোর সময় বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, সুপ্রিম কোর্টে ফের শুনানি হয়। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ED-এর আবেদন নিয়ে এদিন আদালতে মামলাটি গ্রহণযোগ্য কি না এবং ইডির তোলা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে কি না—দুই বিষয়েই বিস্তারিত সওয়াল-জবাব হয়।

মামলাটি শুনছে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি এন. ভি. অঞ্জারিয়ার বেঞ্চ। ইডির অভিযোগ, কলকাতায় I-PAC এবং সংশ্লিষ্ট জায়গায় তল্লাশি চালানোর সময় তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য পুলিশের কয়েকজন আধিকারিক তল্লাশি প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়েছিলেন।

এই অভিযোগের তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।

কী নিয়ে মামলা?

ইডি সংবিধানের Article 32-এর অধীনে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। তাদের দাবি, I-PAC-এর অফিস এবং সংশ্লিষ্ট জায়গায় তল্লাশি অভিযানে যে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হোক।

ইডি আরও চেয়েছে, তদন্তটি রাজ্য পুলিশের পরিবর্তে Central Bureau of Investigation বা CBI-এর হাতে দেওয়া হোক। সংস্থার যুক্তি, অভিযোগের সঙ্গে রাজ্যের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকদের নাম জড়িত থাকায় রাজ্য পুলিশের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে, মামলার বিরোধী পক্ষ ইডির Article 32-এ করা আবেদনটির maintainability বা গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, এফআইআর দায়ের না হওয়া বা তদন্ত সঠিকভাবে না হওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রচলিত ফৌজদারি আইনে প্রয়োজনীয় আইনি প্রতিকার রয়েছে।

ইডির হয়ে কী বলল কেন্দ্র?

শুনানিতে Solicitor General তুষার মেহতা বলেন, ইডি চাইছে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই বিষয়টি নির্ধারণ করুক। কোনও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে মামলাটি ভবিষ্যতে অন্যভাবে দেখা হবে—এমন পরিস্থিতির উপর বিষয়টি ছেড়ে দিতে চায় না কেন্দ্রীয় সংস্থা।

তুষার মেহতার বক্তব্য, “We are pressing our petition. We want Your Lordships to decide whether we are right or wrong.”

অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এস. ভি. রাজু বলেন, অভিযোগের সঙ্গে যদি এমন একজন মুখ্যমন্ত্রীর নাম জড়িত থাকে, যিনি একইসঙ্গে রাজ্য পুলিশের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রাখেন, তাহলে স্বাধীনভাবে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া যায় কি না, সেটিও আদালতকে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন পুরনো রায়ের উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তল্লাশির সময় গুরুত্বপূর্ণ নথি বা রেকর্ড সরিয়ে ফেলার অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, এই অভিযোগগুলির তদন্ত প্রয়োজন।

বিরোধী পক্ষের বক্তব্য কী?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্য প্রতিপক্ষদের হয়ে সওয়াল করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মেনকা গুরুস্বামী। তিনি প্রথমেই ইডির আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি Sakiri Vasu v. State of Uttar Pradesh-সহ একাধিক সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উল্লেখ করেন। তাঁর যুক্তি, কোনও এফআইআর নথিভুক্ত না হলে বা তদন্ত যথাযথ না হলে ফৌজদারি আইনের কাঠামোর মধ্যেই তার প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই সরাসরি সংবিধানের Article 32 ব্যবহার করে সুপ্রিম কোর্টে এই আবেদন করা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা আগে বিচার করা প্রয়োজন।

গুরুস্বামী আরও বলেন, মামলায় যেসব বিষয় নিয়ে পক্ষগুলির মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, সেগুলি মূলত তথ্যগত প্রশ্ন। Article 32-এর মতো সাংবিধানিক বিচারপ্রক্রিয়ায় সাধারণত এই ধরনের বিতর্কিত তথ্য নির্ধারণ করা উচিত নয় বলেও তিনি যুক্তি দেন।

আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ

তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, মামলাটি গ্রহণযোগ্য কি না এবং মূল অভিযোগের merits—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দীর্ঘ পর্যায়ে শুনতে তারা আগ্রহী নয়।

বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র বলেন, “There won’t be piecemeal hearing.” অর্থাৎ মামলার শুনানি খণ্ড খণ্ডভাবে হবে না।

আদালত আরও জানায়, যদি ইডির আবেদন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়, তাহলে তদন্ত CBI-এর হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নটিও আদালত বিবেচনা করতে পারে।

এরপর মেনকা গুরুস্বামী মামলার মূল বিষয় নিয়েও তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যান, যদিও একইসঙ্গে তিনি ইডির আবেদনের maintainability নিয়ে আপত্তি বজায় রাখেন।

২ সেপ্টেম্বর ফের শুনানি

১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট মামলাটির চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি। এদিন Solicitor General তুষার মেহতা এবং ASG এস. ভি. রাজু তাঁদের বক্তব্য শেষ করেন। তবে মেনকা গুরুস্বামীর সওয়াল এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

ফলে মামলাটি পরবর্তী শুনানির জন্য ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেদিন ইডির আবেদন আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না এবং অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাধীন সিবিআই তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেই বিতর্ক আরও এগোবে।

কেস টাইটেল: Directorate of Enforcement & Anr. v. The State of West Bengal & Ors.

কেস নম্বর: W.P.(Crl.) No. 16/2026

বিচারপতি: Justice Prashant Kumar Mishra and Justice N.V. Anjaria

শুনানির তারিখ: ১৮ আগস্ট ২০২৬

পরবর্তী শুনানি: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button