বিহারে ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশের গুলি চালানো নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের জবাব
বলপ্রয়োগ অতিরিক্ত ছিল না, দাবি নীতীশ সরকারের; গুলিচালনার ঘটনাও স্বীকার

ছাত্রদের বিক্ষোভ সামলাতে বিহারে পুলিশের বলপ্রয়োগ কোনওভাবেই “অসামঞ্জস্যপূর্ণ” বা অতিরিক্ত ছিল না বলে সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে রাজ্য সরকার। পরীক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার প্রতিবাদে ছাত্রদের আন্দোলনের সময় পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া মামলায় আদালতে এই বক্তব্য পেশ করেছে বিহার সরকার। একইসঙ্গে রাজ্য সরকার স্বীকার করেছে, সিওয়ানে বিক্ষোভের সময় এক কনস্টেবল AK-47 থেকে গুলি চালিয়েছিলেন। ওই পুলিশকর্মীকে ইতিমধ্যেই সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে।
বিহার সরকারের দেওয়া counter affidavit অনুযায়ী, সিওয়ানের JP Chowk এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় সেখানে মোতায়েন পুলিশ বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এক কনস্টেবল ভিড়ের মধ্যে আটকে পড়েন। এরপর তিনি নিজের কাছে থাকা AK-47 থেকে চার রাউন্ড গুলি আকাশে চালান বলে রাজ্য সরকার জানিয়েছে।
আদালতে দেওয়া হলফনামায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “No one was injured from the bullets of AK-47”। অর্থাৎ AK-47 থেকে ছোড়া গুলিতে কেউ আহত হননি বলে রাজ্যের দাবি।
তবে সিওয়ানের Hathi Chowk এলাকায় আরও একটি গুলিচালনার ঘটনা ঘটে বলে স্বীকার করেছে বিহার সরকার। সেখানে একজন Assistant Sub-Inspector বা ASI ভিড় ছত্রভঙ্গ করার জন্য ৯ মিমি পিস্তল থেকে দুই রাউন্ড গুলি চালান। এই ঘটনায় তিনজন বিক্ষোভকারী সামান্য আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাত পেয়েছিলেন বলে রাজ্য জানিয়েছে।
তবে ওই তিনজনের আঘাত AK-47 থেকে ছোড়া গুলির কারণে হয়নি বলে দাবি করেছে সরকার। বিষয়টি নিশ্চিত করতে ballistic examination বা ব্যালিস্টিক পরীক্ষা এখনও চলছে বলেও আদালতকে জানানো হয়েছে।
বিহার সরকার বিশেষভাবে জানিয়েছে, AK-47 একটি “platoon-level weapon”। এই ধরনের অস্ত্র মূলত বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং সাধারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাধারণত এটি ব্যবহার করার কথা নয়। এই ধরনের রাইফেল ব্যবহারের বিষয়ে রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালক বা DGP-ও নির্দেশিকা জারি করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সিওয়ানে AK-47 ব্যবহারকারী ওই কনস্টেবলকে তাঁর আচরণের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের ভাষায়, তাঁর কাজ ছিল “undesired conduct”। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপও শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, বিহার সরকার আদালতকে জানিয়েছে যে বিক্ষোভ শুধু শান্তিপূর্ণ অবস্থায় সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে ওঠে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে পাথর ছোড়া ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। রাজ্যের দাবি, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় মোট ১৫৭ জন পুলিশকর্মী এবং সাতজন সরকারি কর্মচারী আহত হয়েছেন।
ছাপরা এলাকাতেও হিংসার ঘটনা ঘটে বলে রাজ্য সরকার জানিয়েছে। সেখানে একাধিক পুলিশ আধিকারিক আহত হন। তাঁদের মধ্যে দুজন Block Development Officer বা BDO-ও ছিলেন বলে আদালতে দেওয়া জবাবে জানানো হয়েছে।
তবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলিতে সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই একাধিক অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে। আদালত বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত CCTV ফুটেজ, ড্রোনের ছবি এবং ভিডিও, body-camera ফুটেজসহ অন্যান্য নথি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিল।
শুধু তাই নয়, বিক্ষোভকারীদের ব্যক্তিগত এবং ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও আদালত নির্দেশ দিয়েছিল। পাশাপাশি যেসব নাবালক এবং কোনও ধরনের অপরাধমূলক পূর্ব ইতিহাস নেই এমন ছাত্রদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে তাঁদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনা।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য এবং আগের অন্তর্বর্তী নির্দেশের ভিত্তিতেই মামলার শুনানি এগিয়ে চলেছে। একদিকে বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের বলপ্রয়োগ কতটা যুক্তিসঙ্গত ছিল, অন্যদিকে হিংসাত্মক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ক্ষমতার সীমা কতটা—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই মামলায় সামনে এসেছে।


