জোজারি-বান্দি-লুনি নদীর তীরে নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা, শিল্পেও কড়া সুপ্রিম কোর্ট
নদীদূষণ রুখতে রাজস্থানে নদীর ধারে ১০০ মিটার নির্মাণ নিষেধ, ৫০০ মিটারে বিপজ্জনক শিল্প বন্ধ

রাজস্থানের জোজারি, বান্দি এবং লুনি নদীকে দূষণ ও পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। নদীর কিনারা থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে কোনও ধরনের নির্মাণ বা উন্নয়নমূলক কাজ করা যাবে না। একই সঙ্গে নদীর বর্তমান বন্যা-সীমা বা প্রবাহপথের ৫০০ মিটারের মধ্যে এমন কোনও বিপজ্জনক শিল্প বা কার্যকলাপ চালানো যাবে না, যার ফলে নদীর জল দূষিত, বিষাক্ত বা নদী-পরিবেশের অন্য কোনও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, নদীগুলির উচ্চ বন্যা-সীমা বা High Flood Line এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ ও চিহ্নিত করা হয়নি। সেই কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ৫০০ মিটারের এই অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নদীর প্রান্ত থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে কোনও ধরনের নির্মাণ বা উন্নয়নমূলক কাজ অনুমোদন করা যাবে না। পাশাপাশি, যেখানে বর্তমান বন্যা-সীমা চিহ্নিত রয়েছে, তার দু’পাশে ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনও বিপজ্জনক শিল্প বা দূষণ ঘটাতে পারে এমন কার্যকলাপ চালানো যাবে না। যেখানে বন্যা-সীমা চিহ্নিত হয়নি, সেখানে নদীর বর্তমান প্রবাহপথকে ভিত্তি করে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
রাজস্থানের জোজারি, বান্দি ও লুনি নদীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পদূষণ এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। জোজারি নদী রাজস্থানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর যোধপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বান্দি নদী পালি শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে লুনি নদী বালোট্রার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। বান্দি ও জোজারি নদী বালোট্রা শহরের কাছে লুনি নদীর সঙ্গে মিশেছে।
বিশেষ করে পালি এবং বালোট্রা অঞ্চলে রং ও ছাপার শিল্প গড়ে ওঠায় নদীগুলির দূষণ নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। শিল্পবর্জ্য নদীর জলে মিশে যাওয়ার ফলে পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য নিয়েও গুরুতর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর একটি সংবাদ-তথ্যচিত্রের ভিত্তিতে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্ট। “2 Million Lives at Risk | India’s Deadliest River | Marudhara | Jojari | Rajasthan” শীর্ষক তথ্যচিত্রে জোজারি নদী অঞ্চলের ভয়াবহ দূষণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সাধারণ মানুষের উপর তার প্রভাব তুলে ধরা হয়েছিল। আদালতের সামনে বিষয়টি ওঠে যে, এই দূষণের কারণে রাজস্থানের একাধিক জেলার প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের জীবন, পশুসম্পদ এবং নদীনির্ভর পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্ট একটি High-Level Ecosystem Oversight Committee গঠন করে। নদী পুনরুদ্ধারের কাজকে আরও সমন্বিত করতে রাজস্থান সরকারকে সাত দিনের মধ্যে মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি Integrated Coordination Group গঠনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি জোজারি-বান্দি-লুনি নদী-পরিবেশ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি স্বাধীন River Commission বা River Rejuvenation Authority গঠনের কথাও বলা হয়।
সাম্প্রতিক শুনানিতে Integrated Coordination Group এবং High-Level Ecosystem Oversight Committee-র মধ্যে সদস্যপদের কিছুটা মিল থাকার বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। এতে দুই সংস্থার কাজের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আদালত মনে করেছে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, Integrated Coordination Group মূলত সরকারি দফতরগুলির মধ্যে কাজের সমন্বয়ের জন্য তৈরি একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। এটি High-Level Committee-র স্বাধীন দায়িত্ব বা ক্ষমতার উপর কোনওভাবে হস্তক্ষেপ করবে না।
আদালত আরও জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে কমিটির চেয়ারপার্সন তাঁর নিজস্ব ক্ষমতায় আদালতের নির্দেশ দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ, আদেশ বা ব্যবস্থা নিতে পারবেন। আগে কমিটিকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলিও বহাল থাকবে।
এদিকে জোজারি, বান্দি ও লুনি নদীর দূষণ নিয়ে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া Special Investigation Team বা SIT রিপোর্টও আদালত বিবেচনা করেছে। SIT যোধপুর, পালি ও বালোট্রা এলাকায় নদীদূষণ সংক্রান্ত ১৬টি ফৌজদারি মামলা পর্যালোচনা করেছে। যেখানে প্রাথমিকভাবে গুরুতর অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, সেখানে আরও কঠোর ধারাও যুক্ত করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে CCTV ফুটেজ, ছবি, ভিডিও, নথিপত্রসহ বিভিন্ন তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।
রাজ্য সরকার নদী পুনরুদ্ধার এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন প্রকল্প ও পদক্ষেপের কথাও আদালতকে জানিয়েছে। এর মধ্যে তানাওয়াড়া, সাঙ্গানের-দ্রব্যবতী-নেভতা, মোরেল ড্যাম, আম্বে ভ্যালি, খেদ HRTS/SEP, নেহদা ড্যাম এবং CETP সাঙ্গারিয়ার মতো প্রকল্পের উল্লেখ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয় বা NLU-কে একটি প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি বালোট্রায় জমে থাকা জল ছাড়ার আবেদন নিয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নদী দূষণ মোকাবিলায় রাজস্থান সরকারকে ২০ দফার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরির পরামর্শও দিয়েছে আদালত। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে।
কেস টাইটেল
In Re: 2 Million Lives At Risk, Contamination In Jojari River, Rajasthan



