ঘুষের দাবি প্রমাণে ব্যর্থ প্রসিকিউশন, ২৩ বছর পর বেঞ্চ ক্লার্ককে খালাস দিল বোম্বে হাইকোর্ট
ঘুষের টাকা উদ্ধারের প্রমাণ যথেষ্ট নয়, অবৈধ অর্থ দাবির প্রমাণ অপরিহার্য বলে রায়

প্রায় ২৩ বছর আগে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া পুনের এক বেঞ্চ ক্লার্ককে খালাস দিয়েছে বোম্বে হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, শুধুমাত্র অভিযুক্তের কাছ থেকে চিহ্নিত ঘুষের টাকা উদ্ধার হওয়া দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই অবৈধ অর্থ দাবি বা ডিমান্ড প্রমাণ করতে হবে। এই মৌলিক উপাদান প্রমাণে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হওয়ায় ২০০৩ সালের দোষী সাব্যস্ত করার রায় বাতিল করেছে আদালত।
বিচারপতি এন. জে. জামাদার ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই রায় দেন। তিনি বলেন, প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত প্রমাণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি রয়েছে। এসব অসঙ্গতি উপেক্ষা করে বিচারিক আদালত অনুমানের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল, যা আইনসম্মত নয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শৈলেন্দ্র মণিকরাও বাকারে পুনের একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বেঞ্চ ক্লার্ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ ছিল, একটি ব্যক্তিগত ফৌজদারি মামলায় জামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার জন্য এক অভিযোগকারীর কাছ থেকে তিনি ৫০০ টাকা ঘুষ দাবি করেন।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে মহারাষ্ট্রের অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরো (এসিবি) ফাঁদ পাতে। অভিযানের সময় অভিযুক্তের শার্টের পকেট থেকে চিহ্নিত ৫০০ টাকার নোট উদ্ধার করা হয়। এরপর দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৮-এর ধারা ৭ এবং ধারা ১৩(১)(ডি) সহ ১৩(২)-এর অধীনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। ২০০৩ সালের আগস্টে বিশেষ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। সেই রায়ের বিরুদ্ধেই তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন।
আপিল শুনানিতে বোম্বে হাইকোর্ট প্রসিকিউশনের প্রমাণ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে। আদালতের নজরে আসে, অভিযোগের সময় নিয়ে প্রসিকিউশনের বক্তব্যে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে।
অভিযোগকারী দাবি করেছিলেন, ১৯৯৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর আড়াইটার দিকে অভিযুক্ত তাঁর কাছে ঘুষ দাবি করেন। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা জেরা চলাকালে স্বীকার করেন, অভিযোগকারী ওই দিন সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যেই এসিবি কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।
এই দুই তথ্য একসঙ্গে সত্য হতে পারে না বলে মন্তব্য করে আদালত জানায়, যদি দুপুর আড়াইটায় ঘুষ দাবি করা হয়ে থাকে, তাহলে সকাল ১০টায় সেই অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব নয়।
বিচারপতি জামাদার আরও বলেন, অভিযোগ নথিভুক্ত করা, স্বাধীন পঞ্চ সাক্ষী ডাকা, প্রাথমিক যাচাই, ফাঁদ পাতার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা এবং আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর মতো সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা এত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
আদালত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বীকার করেন, ফাঁদ পাতার আগে অভিযোগকারীর দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। বিচারপতি বলেন, ঘুষ দাবির কোনো স্বাধীন যাচাই না হওয়া প্রসিকিউশনের মামলার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই দুর্বল করে দেয়।
রায়ে হাইকোর্ট পুনরায় স্পষ্ট করেছে যে, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের মামলায় শুধুমাত্র ঘুষের টাকা উদ্ধার হওয়া দোষী সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ের উল্লেখ করে আদালত জানায়, প্রথমে অবৈধ অর্থ দাবির বিষয়টি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে হবে। এরপর অর্থ গ্রহণ এবং অর্থ উদ্ধারের প্রমাণ মিলিয়ে সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ প্রতিষ্ঠিত হলে তবেই দোষ প্রমাণ করা সম্ভব।
এই মামলায় প্রতিরক্ষা পক্ষের এক সাক্ষী দাবি করেন, অভিযোগকারী নিজেই জোর করে টাকাগুলো অভিযুক্তের শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। হাইকোর্ট লক্ষ্য করে, এই বক্তব্যকে জেরার মাধ্যমে কার্যকরভাবে খণ্ডন করতে পারেনি প্রসিকিউশন। ফলে ঘটনাটির একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে সেটিকেও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সব দিক বিবেচনা করে বোম্বে হাইকোর্ট জানায়, বিচারিক আদালত পর্যাপ্ত আইনগত প্রমাণ ছাড়াই অনুমানের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা গুরুতর ভুল।
ফলে ২০০৩ সালের দোষী সাব্যস্ত করার রায় বাতিল করে আদালত শৈলেন্দ্র মণিকরাও বাকারেকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। একই সঙ্গে তাঁর দেওয়া জরিমানার অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়, জামিনের বন্ড বাতিল করে এবং জামিনদারকেও অব্যাহতি প্রদান করে।
কেস টাইটেল: Shailendra Manikrao Bakare v. State of Maharashtra



