শুধু ইন্টারভিউয়ে কেল্লাফতে নয়: সহকারী অধ্যাপক নিয়োগে ইউজিসি-র নিয়মে বড় বদল আনল দিল্লি হাইকোর্ট

বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সহকারী অধ্যাপক (Assistant Professor) নিয়োগের ক্ষেত্রে এবার আর শুধুমাত্র ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে প্রার্থী নির্বাচন করা যাবে না। সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক রায়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি-র (UGC) ২০১৮ সালের একটি নিয়মের অংশবিশেষ সংশোধন বা ‘রিড ডাউন’ (Read Down) করেছে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো স্বচ্ছ মানদণ্ড ছাড়া কেবল ইন্টারভিউয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া অসাংবিধানিক এবং বৈষম্যমূলক।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: কেন শুধু ইন্টারভিউ যথেষ্ট নয়?
বিচারপতিদের মতে, ইউজিসি রেগুলেশন ২০১৮-এর ৪.১.আই.বি ধারাটি এমনভাবে তৈরি ছিল যা ইঙ্গিত দিত যে ইন্টারভিউই নিয়োগের শেষ কথা হতে পারে। আদালত এই ধারণাকে নাকচ করে দিয়েছে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ হলো:
-
স্বেচ্ছাচারিতার ভয়: কোনো পূর্বনির্ধারিত নম্বর বিভাজন বা লিখিত মূল্যায়ন ছাড়া কেবল ইন্টারভিউ নিলে সেখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা দুর্নীতির সুযোগ থাকে।
-
সংবিধানের পরিপন্থী: এই ধরনের নিয়োগ পদ্ধতি ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (সাম্যের অধিকার) এবং ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ (সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ)-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
-
স্বচ্ছতার অভাব: একটি সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অবশ্যই প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণাপত্র এবং অন্যান্য একাডেমিক অর্জনের একটি সুনির্দিষ্ট এবং উদ্দেশ্যমূলক মূল্যায়ন কাঠামো থাকতে হবে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও এনআইইপিএ-র ভূমিকা
এই মামলার সূত্রপাত হয় ড. শচীন কুমার নামে এক প্রার্থীর রিট পিটিশনের মাধ্যমে। তিনি একজন ৭৫ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধী (PwBD) আবেদনকারী ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশনাল প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (NIEPA)-র একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছাড়াই কেবল ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছিল। অবাক করার মতো বিষয় হলো, ইন্টারভিউয়ের পর কাউকেই সেই পদের জন্য যোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়নি।
আদালত এই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ‘অবিচারমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে এনআইইপিএ-র ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ ও আইনানুগ পদ্ধতিতে নিয়োগ শুরুর নির্দেশ দিয়েছে।
প্রতিবন্ধী সংরক্ষণ নিয়ে কড়া বার্তা
এই মামলার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিবন্ধী সংরক্ষণ। আদালত লক্ষ্য করেছে যে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি প্রতিবন্ধীদের (PwBD) জন্য সংরক্ষিত পদটিকে সাধারণ ইডব্লিউএস (EWS) ক্যাটাগরিতে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। হাইকোর্ট একে অবৈধ ঘোষণা করে জানায়, এটি ‘রাইটস অফ পারসনস উইথ ডিসএবিলিটি অ্যাক্ট, ২০১৬’-এর পরিপন্থী। কোনো সংরক্ষিত পদ এভাবে অন্য ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা যায় না।
ভবিষ্যৎ নিয়োগে যা প্রভাব পড়বে
হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে এখন থেকে ইউজিসি অনুমোদিত যেকোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের সময়: ১. ইন্টারভিউয়ের আগে বা সাথে প্রার্থীর একাডেমিক স্কোরের একটি কাঠামোগত মূল্যায়ন থাকতে হবে। ২. নম্বর দেওয়ার পদ্ধতি বা গ্রেডিং সিস্টেম অত্যন্ত স্বচ্ছ হতে হবে। ৩. নিয়োগের প্রতিটি স্তরে কেন একজন প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হচ্ছে বা নেওয়া হচ্ছে, তার যৌক্তিক মানদণ্ড থাকতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, মেধার মূল্যায়ন কেবল মুখে কথোপকথনের মাধ্যমে নয়, বরং তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে হতে হবে।



