সুপ্রিমকোর্ট

গাড়ি জড়িত থাকলেই ক্ষতিপূরণ নয়, কারণের যোগসূত্র প্রমাণ জরুরি: সুপ্রিম কোর্ট

মোটরযান ব্যবহারের সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণেই মিলবে আইনি ক্ষতিপূরণ

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে স্পষ্ট করেছে যে, কোনও ব্যক্তির মৃত্যুতে একটি মোটরযান কোনওভাবে ঘটনাপ্রবাহের অংশ ছিল বলেই মোটরযান আইন (Motor Vehicles Act)-এর অধীনে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাবে না। আদালত বলেছে, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, মোটরযানের ব্যবহারের সঙ্গে ওই মৃত্যু বা আঘাতের একটি স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ কারণগত (causal) সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক প্রমাণিত না হলে মোটরযান আইনের অধীনে দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয় না।

বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহের ডিভিশন বেঞ্চ দিলীপ আগরওয়ালের দায়ের করা আপিল গ্রহণ করে মোটর দুর্ঘটনা দাবি ট্রাইব্যুনাল (MACT) এবং হাইকোর্টের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত রায় বাতিল করে দেয়। তবে আদালত একই সঙ্গে নির্দেশ দেয়, ইতিমধ্যে মৃতের পরিবারের হাতে যে ক্ষতিপূরণের অর্থ পৌঁছে গেছে, তা তাঁদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়া যাবে না।

মামলার সূত্রপাত ২০০৯ সালের ২৯ নভেম্বরের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই দিন আনন্দ নামে এক ব্যক্তিকে শেষবারের মতো দিলীপ আগরওয়ালের চালানো একটি গাড়িতে যেতে দেখা যায়। তিন দিন পর ছত্তিশগড়ের বিনজকোট গ্রামের কাছে আনন্দের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এরপর আনন্দের স্ত্রী রাজশ্রী আগরওয়াল একটি এফআইআর দায়ের করলে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

তদন্ত শেষে দাখিল করা চার্জশিটে অভিযোগ করা হয়, একটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আনন্দকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে। ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালত দিলীপ আগরওয়ালকে দোষী সাব্যস্ত করলেও পরে হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করে তাঁকে খালাস দেয়। হাইকোর্ট জানায়, প্রসিকিউশন যে “শেষবার একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল” (last seen theory) তত্ত্বের উপর নির্ভর করেছিল, তা যথেষ্টভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, আনন্দের স্ত্রী ও সন্তানরা মোটরযান আইনের অধীনে মোটর দুর্ঘটনা দাবি ট্রাইব্যুনালে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেন। তাঁদের দাবি ছিল, ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়িটির ভূমিকা থাকায় মোটরযান আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সেই দাবি মেনে সুদ-সহ প্রায় ৫.৬৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করে। পরে হাইকোর্ট সেই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়িয়ে প্রায় ৮.৬০ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করে।

এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়। মামলার শুনানিতে সর্বোচ্চ আদালত জানায়, মোটরযান আইনে ব্যবহৃত “arising out of the use of a motor vehicle” বা “মোটরযানের ব্যবহারের ফলে উদ্ভূত” কথাটির ব্যাখ্যা অবশ্যই বিস্তৃত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কোনও ঘটনায় গাড়ির নাম উঠে এলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণের অধিকার সৃষ্টি হবে।

আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানায়, মোটরযানের ব্যবহার এবং মৃত্যু বা আঘাতের মধ্যে একটি বাস্তব, প্রত্যক্ষ ও কারণগত সম্পর্ক থাকতে হবে। এই কারণগত যোগসূত্রই আইনের মূল ভিত্তি। আদালত পর্যবেক্ষণে বলে, “শুধুমাত্র দুর্ঘটনা এবং একটি মোটরযান জড়িত ছিল বলেই এই আইনের অধীনে দায় চাপানো যায় না। ‘Arising out of’ বলতে কারণগত সম্পর্ককে বোঝায়। এই সম্পর্ক না থাকলে দায়বদ্ধতাও তৈরি হয় না।”

সুপ্রিম কোর্ট আরও ব্যাখ্যা করে, মোটর দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণের মামলায় ফৌজদারি মামলার মতো সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। এখানে “preponderance of probabilities” অর্থাৎ সম্ভাবনার ভারসাম্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান মামলায় সেই তুলনামূলক সহজ মানদণ্ডও পূরণ হয়নি।

আদালত লক্ষ্য করে, গাড়িটির সঙ্গে আনন্দের মৃত্যুর কোনও বৈজ্ঞানিক বা ফরেনসিক সংযোগ প্রমাণিত হয়নি। কোথাও গাড়ির দুর্ঘটনার অভিযোগ নেই, গাড়িতে রক্ত, চুল, ত্বকের কোষ বা অন্য কোনও ফরেনসিক নমুনাও পাওয়া যায়নি, যা মৃত্যুর সঙ্গে গাড়ির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

ফলে সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, যদিও একটি হত্যার অভিযোগ রয়েছে এবং ঘটনাপ্রবাহে একটি মোটরযানের উল্লেখ রয়েছে, তবুও আইনের দৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় কারণগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই মোটরযান আইনের অধীনে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনও আইনি ভিত্তি নেই।

তবে মামলার বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে জানিয়ে দেয়, ইতিমধ্যে মৃতের পরিবার যে ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছে, তা তাঁদের কাছ থেকে ফেরত আদায় করা হবে না।

কেস টাইটেল: Dilip Agarwal v. Rajshri Agarwal & Ors. (Civil Appeal Nos. of 2026 arising out of SLP (C) Nos. 9002–03 of 2026)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button