খবরাখবর

জামিন আদেশে আইনি ধারার ভুল: বিচারককে বরখাস্ত করা বেআইনি, জানাল সুপ্রিম কোর্ট

ভারতের বিচারব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ রায় দান করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বিচারপ্রক্রিয়ার সময় জামিন আদেশে কেবল আইনের ধারা বা বিধান উল্লেখ করতে ভুল করলে কোনো বিচারককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যাবে না। বিচারকদের স্বাধীনতা এবং সাহসিকতা বজায় রাখতে এই রায়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মধ্যপ্রদেশের একজন অতিরিক্ত জেলা ও সেশন বিচারক। অভিযোগ ছিল, তিনি কয়েকটি জামিন আদেশে প্রাসঙ্গিক আইনের ধারা সঠিকভাবে উল্লেখ করেননি। এই ‘ভুল’ বা ‘গাফিলতি’র কারণে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট তাঁর বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলে, তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ

বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. ভি. বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটি খতিয়ে দেখে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণগুলি নিম্নরূপ:

  • ভুল বনাম অপরাধ: আদালত বলেছে, একজন বিচারক মানুষ, আর তাঁর আদেশে ছোটখাটো যান্ত্রিক বা আইনি ত্রুটি থাকতে পারে। শুধুমাত্র আইনের ধারা ভুল করার অর্থ এই নয় যে বিচারক অযোগ্য বা অসৎ।

  • বরখাস্তের শর্ত: কোনো বিচারককে চাকরি থেকে সরানোর মতো কঠোর শাস্তি দিতে হলে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, পক্ষপাতিত্ব, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অন্য কোনো গুরুতর দুর্নীতি প্রমাণিত হতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিচারকের কোনো ‘খারাপ উদ্দেশ্য’ (Bad Intent) প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ তাঁর প্রশাসনিক ভুলকে অপরাধ হিসেবে দেখা চলবে না।

  • বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা: সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করেছে, একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থার ভিত্তি হলো সাহসী ও নিরপেক্ষ বিচারক। যদি ছোটখাটো ভুলের জন্য তাঁদের বরখাস্তের ভয় দেখানো হয়, তবে তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। অপ্রমাণিত অভিযোগ দিয়ে বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা বিচারব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ

আদালত এই মামলায় ওই বিচারককে অবিলম্বে তাঁর চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, গত সময়ের সম্পূর্ণ বেতন, যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা এবং বকেয়া বেতনের ওপর ৬ শতাংশ হারে সুদ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দেশজুড়ে বার্তা

সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ের কপি দেশের প্রতিটি উচ্চ আদালতে (High Court) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, জেলা স্তরের বিচারকদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতগুলো যেন আরও সতর্ক, বিচক্ষণ এবং সহানুভূতিশীল হয়। সামান্য ত্রুটির জন্য যেন কোনো যোগ্য বিচারকের কর্মজীবন নষ্ট না হয়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ।

এই রায় বিচারকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটিও স্পষ্ট করল যে, ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য হলো সত্য উদঘাটন করা, কেবল যান্ত্রিকভাবে আইনের ধারা পালন করা নয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button