বাল্যবিবাহের অভিযোগেই পকসো মামলা নয়, জানাল কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে
পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ মামলায় আদালতের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করল হাইকোর্ট

কলকাতা হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে জানিয়েছে, শুধুমাত্র বাল্যবিবাহের অভিযোগ থাকলেই পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের (Mutual Consent Divorce) আবেদন শুনানিকারী আদালত পকসো (POCSO) আইনের অধীনে ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দিতে পারে না। আদালত বলেছে, হিন্দু বিবাহ আইন (Hindu Marriage Act)-এর ১৩বি ধারার অধীনে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন শুনতে গিয়ে বিচারককে তাঁর আইনি এখতিয়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। সেই সীমা অতিক্রম করে পকসো মামলার নির্দেশ দেওয়া আইনসম্মত নয়।
বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ অতিরিক্ত জেলা বিচারকের একটি আদেশ বাতিল করে এই মন্তব্য করে। একই সঙ্গে আদালত বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনটি আইন অনুযায়ী নতুন করে বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত পাঠিয়েছে।
মামলার সূত্রপাত হয় গোয়রাম বর্মন এবং মধুমিতা বর্মনের যৌথভাবে দায়ের করা পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনকে ঘিরে। অতিরিক্ত জেলা বিচারক সেই আবেদন খারিজ করে দেন। বিচারকের মতে, এই বিয়ে Prohibition of Child Marriage Act, 2006-এর বিধান লঙ্ঘন করে সম্পন্ন হয়েছিল, অর্থাৎ এটি ছিল একটি বাল্যবিবাহ।
শুধু আবেদন খারিজ করেই বিচারক থেমে থাকেননি। তিনি ভগবানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিককে নির্দেশ দেন, তাঁর আদেশটিকেই পকসো আইনের ১৯ ধারার অধীনে প্রাপ্ত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করে একটি ফৌজদারি মামলা নথিভুক্ত করতে।
এই আদেশের বিরুদ্ধে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করেন। তাঁরা আদালতকে জানান, নিম্ন আদালতের আদেশ আইনসঙ্গত নয় এবং সেটি বাতিল করে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হোক।
হাইকোর্ট মামলার শুনানিতে জানায়, হিন্দু বিবাহ আইনের ১৩বি ধারার অধীনে পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন বিচার করার সময় আদালতের একমাত্র দায়িত্ব হল আইনে নির্ধারিত শর্তগুলি পূরণ হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা। শর্ত পূরণ হলে আদালত বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি দিতে পারে।
ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলে, “এই ধরনের মামলায় আদালতের কাজ ছিল কেবল ১৩বি ধারায় নির্ধারিত শর্তগুলি পূরণ হয়েছে কি না তা যাচাই করা এবং শর্ত পূরণ হলে পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি প্রদান করা।”
আদালত আরও স্পষ্ট করে যে, হিন্দু বিবাহ আইন কোনও বিবাহবিচ্ছেদ আদালতকে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সম্পন্ন হওয়া বিয়েকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাতিল (void) বা বাতিলযোগ্য (voidable) ঘোষণা করার ক্ষমতা দেয় না।
হাইকোর্ট উল্লেখ করে, Prohibition of Child Marriage Act, 2006 অনুযায়ী বাল্যবিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না; বরং সংশ্লিষ্ট অপ্রাপ্তবয়স্ক পক্ষ চাইলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সেই বিয়ে বাতিলযোগ্য ঘোষণা করার আবেদন করতে পারে। কিন্তু বর্তমান মামলায় স্বামী বা স্ত্রী—কেউই বিয়ে বাতিলের আবেদন করেননি। তাঁরা কেবল পারস্পরিক সম্মতিতে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান চেয়েছিলেন।
আদালত আরও লক্ষ্য করে, বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনে কোথাও এমন কোনও অভিযোগ করা হয়নি, যা থেকে পকসো আইনের অধীনে কোনও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে। ফলে শুধুমাত্র বাল্যবিবাহের অভিযোগের ভিত্তিতে পকসো মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা বিচারকের ছিল না।
হাইকোর্ট মন্তব্য করে, “এই ধরনের কোনও অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও পকসো মামলা নথিভুক্ত করার নির্দেশ দিয়ে বিচারক তাঁর আইনি এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন।”
ডিভিশন বেঞ্চ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। আদালত জানায়, সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত জেলা বিচারক একই সঙ্গে ওই জেলার মনোনীত পকসো আদালতের বিচারকও ছিলেন। তাঁর নির্দেশে যদি পকসো মামলা শুরু হতো, তাহলে কার্যত তিনিই অভিযোগের সূচনা করতেন এবং পরবর্তীতে সেই মামলার বিচারও করতেন। এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
আদালত স্মরণ করিয়ে দেয়, “কেউই নিজের মামলার বিচারক হতে পারেন না।” তাই এই ধরনের পরিস্থিতি বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সব দিক বিবেচনা করে কলকাতা হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বরের নিম্ন আদালতের আদেশ বাতিল করে দেয়। পাশাপাশি ওই আদেশের ভিত্তিতে যদি কোনও ফৌজদারি মামলা বা অভিযোগ নথিভুক্ত হয়ে থাকে, সেটিও বাতিল করার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনটি আইন অনুযায়ী নতুন করে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত পাঠানো হয়।
কেস টাইটেল: Goyram Barman v. Madhumita Barman (FA 46 of 2026, IA No. CAN 1 of 2026)



