সুপ্রিমকোর্ট

বিবাহবিচ্ছেদ চুক্তির নিষ্পত্তি বদলাবে না, জানাল সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

পারস্পরিক সমঝোতার শর্ত পূরণ হলে নতুন করে ভরণপোষণের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়

সুপ্রিম কোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়েছে, বিবাহবিচ্ছেদের সময় পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে হওয়া আর্থিক নিষ্পত্তি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হওয়ার পর, বহু বছর পরে সেই চুক্তি নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা যায় না। আদালত বেঙ্গালুরুর এক মহিলার আবেদন খারিজ করে জানিয়েছে, উভয় পক্ষের স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি অনেক আগেই হয়ে গেছে।

বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহ এবং বিচারপতি সঞ্জয় করোলের ডিভিশন বেঞ্চ বিজয়লক্ষ্মী আর. (Vijayalakshmi R.)-এর করা আপিল খারিজ করে পরিবার আদালত (Family Court) এবং কর্ণাটক হাইকোর্টের আগের রায় বহাল রাখে।

মামলার পটভূমি

বিজয়লক্ষ্মী ও সি. এল. বালাজির (C. L. Balaji) বিয়ে হয় ২০০০ সালের মে মাসে। ২০০৬ সালে তাঁদের এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। ২০১১ সাল থেকে তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন এবং পরে পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন।

২০১৫ সালের আগস্ট মাসে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে বিবাহবিচ্ছেদের পর আর্থিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলি নির্ধারণ করা হয়। সেই চুক্তির ভিত্তিতেই পরিবার আদালত তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর করে।

বিতর্কের সূত্রপাত হয় কয়েক বছর পরে। সমঝোতা চুক্তির ধারা ৯ (Clause 9)-এ উল্লেখ ছিল, স্বামী তাঁর বার্ষিক আয়ের ২০ শতাংশ ছেলের শিক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রদান করবেন। স্ত্রী দাবি করেন, এই শর্তটি এখনো কার্যকর এবং সেই অনুযায়ী অর্থ পাওয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে।

অন্যদিকে, স্বামীর দাবি ছিল, ধারা ১০ (Clause 10) অনুযায়ী তিনি ধারা ৮-এ নির্ধারিত মোট ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকার মধ্যে প্রথম কিস্তি হিসেবে ১ কোটি টাকা পরিশোধ করার পর ধারা ৯-এর দায়িত্বও শেষ হয়ে যায়। পরে তিনি ২০১৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে মোট ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি পরিশোধ করেন। ফলে তাঁর আর কোনো আর্থিক দায় বাকি নেই।

২০২২ সালে স্ত্রী পরিবার আদালতে একটি এক্সিকিউশন পিটিশন দায়ের করে স্বামীর বার্ষিক আয়ের ২০ শতাংশ এবং তার উপর সুদ দাবি করেন। পরিবার আদালত সেই আবেদন খারিজ করে। পরে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে কর্ণাটক হাইকোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

সুপ্রিম কোর্টে উভয় পক্ষের বক্তব্য

স্ত্রীর আইনজীবীর দাবি ছিল, ধারা ৯ একটি স্বাধীন এবং চলমান প্রতিশ্রুতি। এটি ধারা ৮-এ নির্ধারিত এককালীন অর্থপ্রদানের সঙ্গে যুক্ত নয়। তাঁর মতে, একজন পিতার সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব সন্তান ১৮ বছর পার করলেও শেষ হয় না, বিশেষ করে সে যদি এখনও পড়াশোনা করে।

অন্যদিকে, স্বামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, ধারা ৮, ৯ ও ১০ একই আর্থিক সমঝোতার অংশ। ধারা ৯ শুধুমাত্র অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য ছিল, যখন সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করা হচ্ছিল। ধারা ১০ কার্যকর হওয়ার পর পুরো নিষ্পত্তি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া স্ত্রী ২০১৭ সালের পর দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর কোনো দাবি তোলেননি, বিভিন্ন রিলিজ ডিড ও ‘নো অবজেকশন’ নথিতেও স্বাক্ষর করেছেন এবং ২০২৩ সালের একটি হলফনামায় সম্পূর্ণ নিষ্পত্তির অর্থ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ

সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ধারা ১০-এর ভাষা অত্যন্ত স্পষ্ট। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, স্বামী ১ কোটি টাকা পরিশোধ করার পর আর কোনো ভরণপোষণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এই ধারা ধারা ৯-এর জন্য কোনো আলাদা ব্যতিক্রম রাখেনি।

আদালত আরও বলে, ধারা ৮, ৯ ও ১০-কে আলাদা প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা যাবে না। এগুলি একই সমঝোতার পরস্পর-সংযুক্ত অংশ। যদি ধারা ৯-কে স্থায়ী ও স্বাধীন দায়বদ্ধতা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে ধারা ১০ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।

বেঞ্চ আরও উল্লেখ করে, একজন সচেতন ব্যক্তি হলে যথাসময়ে দাবি জানাতেন। কিন্তু স্ত্রী দীর্ঘ সময় কোনো দাবি না তোলায় বোঝা যায়, তিনিও মনে করেছিলেন যে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

আদালত আরও স্পষ্ট করে যে, এক্সিকিউশন কোর্ট কোনো ডিক্রি বা সমঝোতা চুক্তিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা বা পরিবর্তন করতে পারে না। নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট একই সিদ্ধান্তে পৌঁছালে তা স্পষ্ট ভুল না হলে সুপ্রিম কোর্ট সাধারণত তাতে হস্তক্ষেপ করে না।

আদালতের সিদ্ধান্ত

সব দিক বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট আপিল খারিজ করে দেয়। আদালত জানায়, ধারা ৯ শুধুমাত্র একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা ছিল এবং ধারা ৮ ও ১০ অনুযায়ী অর্থপ্রদান সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটির কার্যকারিতাও শেষ হয়েছে।

এছাড়া, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে ছেলের জন্য ৬ থেকে ৬.৫ কোটি টাকার পৃথক শিক্ষা তহবিল গঠনের আবেদনও আদালত গ্রহণ করেনি।

তবে আদালত উল্লেখ করে, মামলার অন্তর্বর্তী আদেশ অনুযায়ী স্বামী ইতিমধ্যেই বিদেশে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও চিপ ডিজাইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ছেলের নামে ১ কোটি টাকা প্রদান করেছেন। তিনি সেই অর্থ ফেরত চাওয়ার অধিকারও ত্যাগ করেছেন। আদালত নির্দেশ দেয়, ওই অর্থ সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্যই সংরক্ষিত থাকবে এবং মা নিশ্চিত করবেন যে তা শুধুমাত্র সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হবে।

ফলে সুপ্রিম কোর্ট আপিল খারিজ করে এবং মামলায় কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে খরচ ধার্য করেনি।

কেস টাইটেল: Vijayalakshmi R. v. C. L. Balaji
কেস নম্বর: Civil Appeal of 2026 (Arising out of SLP (C) No. 19770 of 2025)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button