খবরাখবর

অ্যাডভোকেটস সংশোধনী বিল ২০২৬-এর খসড়া প্রকাশ করল বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া

৩১ জুলাই পর্যন্ত মতামত আহ্বান, আইনজীবী পেশায় একাধিক বড় সংস্কারের প্রস্তাব

বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (BCI) ১৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে ড্রাফট অ্যাডভোকেটস (সংশোধনী) বিল, ২০২৬ জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে। সংস্থার দাবি, এটি অ্যাডভোকেটস অ্যাক্ট, ১৯৬১-এর একটি বিস্তৃত ও আইনজীবীকেন্দ্রিক সংস্কার প্রস্তাব, যার লক্ষ্য আইনজীবীদের কল্যাণ, আইনি শিক্ষার মানোন্নয়ন, আইন সংস্থার (Law Firm) স্বীকৃতি, নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিদেশি আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণ এবং আইন পেশার আধুনিকীকরণ।

বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, রাজ্য বার কাউন্সিল, বার অ্যাসোসিয়েশন, আইন বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্টার অব লিগ্যাল এডুকেশন, ল ফার্ম এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজন এই খসড়া বিলের ওপর মতামত দিতে পারবেন।

মতামত জমা দেওয়ার শেষ সময়: ৩১ জুলাই ২০২৬, দুপুর ৩টা
ই-মেল: draftadvact2026bill@gmail.com। নির্ধারিত সময়ের পরে আর কোনো মতামত গ্রহণ করা হবে না।

খসড়া বিলের প্রধান প্রস্তাবগুলি

১. আইনজীবীদের কল্যাণে নতুন তহবিল ও সামাজিক নিরাপত্তা

অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের ধারা ৬ ও ৭ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আইনজীবীদের জন্য বীমা, পেনশন, চিকিৎসা সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা, প্রতিবন্ধী আইনজীবীদের সহায়তা এবং আইনজীবীদের নির্ভরশীল পরিবারের কল্যাণে বিশেষ তহবিল ও ট্রাস্ট গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হবে।

২. পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ

বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া এবং রাজ্য বার কাউন্সিলগুলিকে আরবিট্রেশন, মধ্যস্থতা (Mediation), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার আইন, কর আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনি চর্চা-সহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

৩. রাজ্য বার কাউন্সিলে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি

ধারা ৩ সংশোধন করে নির্বাচিত ও মনোনীত সদস্যের সমন্বয়ে রাজ্য বার কাউন্সিলে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

৪. বার অ্যাসোসিয়েশনকে আইনি স্বীকৃতি

ধারা ৬ সংশোধনের মাধ্যমে বার অ্যাসোসিয়েশনগুলিকে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য বার কাউন্সিলকে তাদের কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং আইনজীবীদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার ক্ষমতা দেওয়া হবে।

৫. এনরোলমেন্ট ফি বৃদ্ধি

ধারা ২৪ সংশোধন করে আইনজীবী হিসেবে নাম নথিভুক্তির (Enrolment) ফি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • রাজ্য বার কাউন্সিলের জন্য: ₹১৮,০০০
  • বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার জন্য: ₹৪,৫০০

তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST) এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ডের প্রতিবন্ধী (Benchmark Disability) প্রার্থীদের জন্য ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিসিআই জানিয়েছে, Gaurav Kumar v. Union of India (2025) 1 SCC 641 এবং Pankaj Sinha v. Bar Council of India (WP No. 1261/2025) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এনরোলমেন্ট ফি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল। ১৯৯৩ সালের পর থেকে ফি কার্যত অপরিবর্তিত থাকলেও বার কাউন্সিলের দায়িত্ব ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

৬. ভারতীয় ল ফার্মকে আইনি স্বীকৃতি

নতুন চ্যাপ্টার IIIA (ধারা 28A ও 28B) সংযোজন করে ভারতীয় ল ফার্মগুলিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া এবং বার কাউন্সিলের কাছে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

৭. ভারতীয় আদালতে শুধুমাত্র ভারতীয় আইনজীবীদের অধিকার

খসড়া বিলে বলা হয়েছে, ভারতের আদালত, ট্রাইব্যুনাল ও আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষের সামনে মামলা পরিচালনার একচেটিয়া অধিকার ভারতীয় আইনজীবীদেরই থাকবে।

৮. বিদেশি আইনজীবীদের ওপর বিধিনিষেধ

বিদেশি আইনজীবী বা বিদেশি ল ফার্মকে ভারতের আদালতে উপস্থিত হওয়া, ভারতীয় আইনের মামলা পরিচালনা করা বা অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের অধীনে নথিভুক্ত ভারতীয় আইনজীবীদের সমান অধিকার দাবি করার অনুমতি দেওয়া হবে না।

তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিশি (International Commercial Arbitration)-তে, যেখানে বিদেশি আইন প্রযোজ্য, সেখানে নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে বিদেশি আইনজীবীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

৯. বিদেশি নাগরিকদের এনরোলমেন্টে পরিবর্তন

ধারা ২৪-এর সেই বিধানটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে পারস্পরিকতার (Reciprocity) ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিকদের ভারতীয় আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে ভবিষ্যতে বিদেশি নাগরিকরা সাধারণভাবে ভারতে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারবেন না।

১০. পারস্পরিকতার নীতি

যেসব দেশ ভারতীয় আইনজীবী বা ভারতীয় ল ফার্মকে তাদের দেশে কাজ করার অনুমতি দেয় না, সেই দেশগুলির আইনজীবী ও ল ফার্মের ওপরও ভারত একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে।

১১. ২৫ সদস্যের লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি

ধারা ১০ সংশোধন করে বিচার বিভাগ, বার, শিক্ষাজগৎ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে ২৫ সদস্যের লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

১২. আইন কোর্সে ভর্তির জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা

ধারা ৭ সংশোধনের মাধ্যমে বিসিআইকে আইন ডিগ্রি কোর্সে ভর্তির জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা নেওয়া এবং ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

১৩. অল ইন্ডিয়া বার পরীক্ষার নিয়ম

ধারা ৭ ও ৪৯ সংশোধন করে আইনি শিক্ষার মানদণ্ড নির্ধারণ এবং অল ইন্ডিয়া বার এক্সামিনেশন (AIBE)-সহ বার পরীক্ষার নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা বিসিআইকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

১৪. আইনজীবীদের পরিচয় ও কর্মস্থল যাচাই

নতুন ধারা ১৯এ সংযোজন করে রাজ্য বার কাউন্সিলকে আইনজীবীদের প্রকৃত কর্মস্থল এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতা দেওয়া হবে।

১৫. দণ্ডিত আইনজীবীদের নাম বাতিল

নতুন ধারা ২৪সি অনুযায়ী, কোনো আইনজীবী দুই বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তাঁর নাম স্টেট রোল থেকে বাদ দেওয়া যাবে। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে পুনরায় এনরোলমেন্টের সুযোগ থাকবে।

১৬. বার কাউন্সিল নির্বাচন ট্রাইব্যুনাল

নতুন ধারা ১৪এ ও ১৫এ সংযোজন করে অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অথবা কোনো হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ইলেকশন ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বার কাউন্সিল নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করবে।

১৭. বিদেশি আইনজীবী ও ‘ফ্লাই-ইন ফ্লাই-আউট’ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ

বিদেশি আইনজীবী, বিদেশি ল ফার্ম এবং Fly-in Fly-out পদ্ধতিতে অস্থায়ীভাবে আইনি পরিষেবা দেওয়ার জন্য নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের বিস্তারিত বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৮. ২০২৫ সালের খসড়ার কিছু বিতর্কিত প্রস্তাব বাদ

বিসিআই জানিয়েছে, ২০২৫ সালের খসড়া বিলে থাকা কয়েকটি বিতর্কিত প্রস্তাব বর্তমান খসড়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • আইনজীবীদের ধর্মঘটের জন্য শাস্তির বিধান,
  • বার অ্যাসোসিয়েশনের পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা,
  • আইনজীবীদের ওপর বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা,
  • বার কাউন্সিলে সরকারি মনোনয়নের বিধান।

১৯. নতুন সংজ্ঞা সংযোজন

খসড়া বিলে ‘Law Firm’, ‘Foreign Lawyer’, ‘Foreign Law Firm’ এবং ‘Fly-in Fly-out Practice’-এর সংজ্ঞা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে এই ক্ষেত্রগুলির জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা যায়।

বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, প্রাপ্ত সব মতামত পর্যালোচনা করার পর চূড়ান্ত সংশোধনী বিল প্রস্তুত করা হবে এবং পরবর্তী আইন প্রণয়নের জন্য সরকারের কাছে পাঠানো হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button