ভিভো মামলায় চীনা কর্মকর্তার বিদেশযাত্রার আবেদন খারিজ করল দিল্লি হাইকোর্ট
মানবিক কারণ স্বীকার করেও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিল আদালত

দিল্লি হাইকোর্ট অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন (PMLA)-এর মামলায় অভিযুক্ত এক চীনা নাগরিক ও ভিভো (Vivo)-র এক কর্মকর্তাকে চীনের গুয়াংঝৌ শহরে যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছে। আদালতের কাছে তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর ৮২ বছর বয়সি বাবা গুরুতর অসুস্থ এবং লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। শেষবারের মতো বাবার পাশে থাকার সুযোগ চেয়ে তিনি বিদেশ যাওয়ার আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত জানিয়েছে, মানবিক দিক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন অভিযুক্তের উপস্থিতি নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি। তাই এই পরিস্থিতিতে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া যায় না। বিচারপতি মধু জৈন ৯ জুলাই ২০২৬ এই নির্দেশ দেন।
মামলার পটভূমি
এই আবেদনটি করা হয় Directorate of Enforcement v. MS Vivo Mobile Communication and Ors. মামলায়। আবেদনকারী ছিলেন গুয়াংওয়েন কুয়াং ওরফে অ্যান্ড্রু (Guangwen Kuang @ Andrew)। তিনি আদালতের কাছে সাময়িকভাবে চীনের গুয়াংঝৌ যাওয়ার অনুমতি এবং তাঁর পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার আবেদন জানান।
আবেদনকারী জানান, তাঁর ৮২ বছর বয়সি বাবা মস্তিষ্কে গুরুতর রক্তক্ষরণের (Brain Haemorrhage) শিকার হয়েছেন এবং চীনে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, বাবার জীবনের শেষ সময়ে তাঁর পাশে থাকতে চান। একই সঙ্গে তিনি আদালতকে আশ্বাস দেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি ভারতে ফিরে আসবেন।
অন্যদিকে, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এই আবেদনের বিরোধিতা করে। ইডির দাবি, আবেদনকারী এমন একটি অর্থপাচারের মামলায় অভিযুক্ত, যেখানে অভিযোগ অনুযায়ী অপরাধলব্ধ অর্থের পরিমাণ ২.০২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া ভারত ও চীনের মধ্যে প্রত্যর্পণ (Extradition) চুক্তি না থাকায় আবেদনকারী বিদেশে চলে গেলে তাঁকে ফেরত আনা অত্যন্ত কঠিন হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি মধু জৈন বলেন, আবেদনকারীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতির প্রতি আদালতের সহানুভূতি রয়েছে। তবে শুধুমাত্র মানবিক কারণ দেখিয়ে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যায় না।
আদালত পর্যবেক্ষণ করে, এ ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনার পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বার্থ এবং অভিযুক্তের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
আদালত আরও উল্লেখ করে, ভারত ও চীনের মধ্যে বর্তমানে কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) কিংবা ফৌজদারি বিষয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি (Mutual Legal Assistance Treaty – MLAT) নেই। ফলে আবেদনকারীর দেওয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করতেও দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে।
রায়ে আদালত কর্ণাটক হাইকোর্টের একটি পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তেরও উল্লেখ করে জানায়, কোনো বিদেশি নাগরিককে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কাঠামো এবং অভিযুক্তকে ফেরত আনার কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না, তা বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদালত আরও দেখতে পায়, আবেদনকারীর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের দেওয়া অঙ্গীকারপত্র (Undertaking) আইনিভাবে বাধ্যতামূলক নয়। একই সঙ্গে চীনের কোনো কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষও আবেদনকারীর ভারতে ফিরে আসার বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।
এছাড়া আবেদনকারী সুপ্রিম কোর্টের Wu Chuaannan মামলার রায়ের ওপর নির্ভর করলেও দিল্লি হাইকোর্ট জানায়, সেই মামলার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। সেখানে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ব্যাংক গ্যারান্টি, পূর্বে আদালতের শর্ত মেনে দেশে ফেরার নজির এবং চীনা কনস্যুলেটের নিশ্চয়তার মতো একাধিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল। বর্তমান মামলায় সেসবের কোনোটিই নেই।
আদালতের সিদ্ধান্ত
সব দিক বিবেচনা করে দিল্লি হাইকোর্ট আবেদনকারীর বিদেশযাত্রার অনুমতির আবেদন খারিজ করে দেয়।
আদালত জানায়, অভিযোগের গুরুত্ব, বিপুল অঙ্কের কথিত অপরাধলব্ধ অর্থ, আবেদনকারীর বিদেশি নাগরিক হওয়া এবং তাঁকে ভারতে ফেরানোর কার্যকর আইনি ব্যবস্থা না থাকায় বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, এই রায় কেবল বিদেশযাত্রার আবেদন সংক্রান্ত। এর কোনো পর্যবেক্ষণ মূল অর্থপাচার মামলার বিচার বা অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। সেই মামলার বিচার আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে চলবে।
কেস টাইটেল: Directorate of Enforcement v. MS Vivo Mobile Communication and Ors. – Guangwen Kuang @ Andrew
কেস নম্বর: CRL.M.C. 4417/2026



