সুপ্রিমকোর্ট

চুক্তি ভঙ্গ মানেই প্রতারণা নয়, গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে

যৌথ উন্নয়ন চুক্তি ঘিরে বিরোধ মূলত দেওয়ানি, ফৌজদারি মামলা বাতিল করল আদালত

যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট) চুক্তি ভেঙে যাওয়াকে শুধুমাত্র প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা হিসেবে চালানো যায় না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত স্পষ্ট করেছে, চুক্তি সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান না থাকলে সেটিকে ফৌজদারি মামলায় রূপ দেওয়া বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দুই জমির মালিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রতারণা ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মামলা বাতিল করে দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

বিচারপতি বি. ভি. নাগারথনা এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার বেঞ্চ এই রায়ে মাদ্রাজ হাই কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশও বাতিল করে দেয়, যেখানে ফৌজদারি কার্যক্রম খারিজ করতে অস্বীকার করা হয়েছিল।

মামলার সূত্রপাত ২০১২ সালের মে মাসে। ওই সময় জমির মালিক জি. সামীনাথন এবং এস. রাধিকা মালিনীর সঙ্গে একটি নির্মাণ সংস্থার যৌথ উন্নয়ন চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাণকারী সংস্থা ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা আমানত হিসেবে ৩ কোটি টাকা জমির মালিকদের দেয়। পাশাপাশি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবিধার্থে জমির মালিকরা সংস্থার অনুকূলে একটি জেনারেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (GPA) সম্পাদন করেন।

পরবর্তীতে চেন্নাই মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (CMDA) প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুমোদনের আবেদন খারিজ করে দেয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, সংশ্লিষ্ট জমিটি একটি অননুমোদিত লেআউটের অংশ হওয়ায় অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।

এর কয়েক বছর পর জমির মালিকরা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল করে একই জমি অন্য এক ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর নির্মাণকারী সংস্থা অভিযোগ করে, জমির মালিকরা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন এবং অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হয়। পরে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারার সঙ্গে ১০৯ এবং ৩৪ ধারা যুক্ত করে চার্জশিটও জমা দেওয়া হয়।

জমির মালিকরা এই ফৌজদারি মামলা বাতিলের আবেদন জানিয়ে মাদ্রাজ হাই কোর্টে গেলেও সেখানে তাঁরা স্বস্তি পাননি। এরপর তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।

মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট খতিয়ে দেখে, অভিযোগে সত্যিই অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ বা প্রতারণার প্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে কি না।

আদালত জানায়, কোনও বাণিজ্যিক চুক্তির অধীনে ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা আমানত গ্রহণ করলেই তা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারার অধীনে “অর্পিত সম্পত্তি” (Entrustment) হিসেবে গণ্য হয় না। আদালত আরও লক্ষ্য করে, জমির মালিকরা ৩ কোটি টাকা ফেরত দিতে প্রস্তুত ছিলেন এবং পরিবর্তে মূল দলিলপত্র ফেরত চেয়েছিলেন। তাই অর্থ আত্মসাতের অসৎ উদ্দেশ্যের অভিযোগও দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রতারণার অভিযোগ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে জানায়, ৪২০ ধারার অপরাধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে লেনদেনের একেবারে শুরু থেকেই অভিযুক্তের অসৎ বা প্রতারণার উদ্দেশ্য থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমান মামলায় দেখা যায়, উভয় পক্ষই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিল। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করা হয়েছিল, পরিকল্পনা অনুমোদনের আবেদনও করা হয়েছিল। পরে সরকারি অনুমতি না পাওয়ার কারণেই প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়। তাই শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল— এমন কোনও প্রাথমিক প্রমাণ আদালতের সামনে আসেনি।

সুপ্রিম কোর্ট পূর্ববর্তী একাধিক রায়ের উল্লেখ করে পুনরায় জানায়, “শুধুমাত্র চুক্তি ভঙ্গের ঘটনা থেকে প্রতারণার ফৌজদারি মামলা তৈরি হয় না, যদি না শুরু থেকেই প্রতারণামূলক বা অসৎ উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়।”

আদালত আরও স্পষ্ট করে, একই ঘটনার ভিত্তিতে প্রতারণা এবং অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ— এই দুই অভিযোগ সাধারণত একসঙ্গে টেকসই হয় না, কারণ দুটি অপরাধের আইনি উপাদান সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বেঞ্চের মতে, এই বিরোধ সম্পূর্ণভাবে যৌথ উন্নয়ন চুক্তি থেকে উদ্ভূত দেওয়ানি বিরোধ। একই বিষয়ে সালিশি (Arbitration) প্রক্রিয়াও চলছিল এবং সালিশি রায়ের বিরুদ্ধেও আইনি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। ফলে এই পরিস্থিতিতে ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া বিচারব্যবস্থার অপব্যবহারের শামিল।

State of Haryana v. Bhajan Lal মামলায় নির্ধারিত নীতির উপর নির্ভর করে সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত দেয় যে, এই মামলা সেই ধরনের বিরোধের মধ্যে পড়ে যেখানে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করা উচিত।

ফলে আদালত মাদ্রাজ হাই কোর্টের ২৮ মার্চ ২০২৫-এর রায় বাতিল করে। একই সঙ্গে ২০২১ সালের এফআইআর, ২৩ মার্চ ২০২৩-এর চার্জশিট এবং চেন্নাইয়ের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন সমস্ত ফৌজদারি কার্যক্রমও খারিজ করে দেওয়া হয়। তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই রায়ের ফলে পক্ষগুলির দেওয়ানি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ হবে না এবং সেই বিরোধ আইন অনুযায়ী পৃথকভাবে নিষ্পত্তি হবে।

কেস টাইটেল: G. Saminathan & Another v. The State, represented by the Sub-Inspector of Police & Another

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button