হাইকোর্ট

নোটিশ ছাড়া উচ্ছেদ ও ভাঙা যাবে না, জানাল কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে

আধার কার্ড প্রাথমিক বসবাসের প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া মানতেই হবে কর্তৃপক্ষকে

কলকাতা হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট (প্রাক্তন কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট) কর্তৃপক্ষের গার্ডেনরিচের ব্রুক লেন এলাকায় অবস্থিত ক্যালকাটা ডক লেবার বোর্ড (CDLB) এবং ক্যালকাটা পোর্ট ট্রাস্ট (CPT)-এর আবাসিক কোয়ার্টার ভাঙা ও বাসিন্দাদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনও ব্যক্তি অননুমোদিত দখলদার বলে মনে করলেই Public Premises (Eviction of Unauthorised Occupants) Act, 1971-এ নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি উচ্ছেদ বা ভাঙার অভিযান চালানো যায় না।

বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলেছে, আধার কার্ড কোনও ব্যক্তির বসবাসের চূড়ান্ত প্রমাণ না হলেও, এটি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে তাঁর দখল বা বসবাসের প্রাথমিক (prima facie) প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। তাই এই ধরনের নথি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনে নির্ধারিত সুযোগ না দিয়ে উচ্ছেদ করা যাবে না।

মামলার সূত্রপাত হয় একক বেঞ্চের একটি রায়কে ঘিরে। একক বেঞ্চ মোহাম্মদ ইদ্রিশ ও অন্যান্য বাসিন্দার দায়ের করা রিট আবেদন খারিজ করে দেয়। ওই আবেদনে তাঁরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ব্রুক লেনের ওই সরকারি আবাসনে বসবাস করছেন। কিন্তু কোনও ধরনের নোটিশ না দিয়ে এবং Public Premises Act, 1971-এ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই পোর্ট কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ ও ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছে।

বাসিন্দারা আদালতে তাঁদের বসবাসের প্রমাণ হিসেবে আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র এবং গ্যাস সংযোগের বিল জমা দেন। অন্যদিকে পোর্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করে, এসব নথি সংশ্লিষ্ট আবাসনে তাঁদের বৈধ দখল প্রমাণ করে না। পাশাপাশি তারা জানায়, ভবনগুলি অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে, তাই দ্রুত ভেঙে ফেলা প্রয়োজন।

ডিভিশন বেঞ্চ একক বেঞ্চের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত হয়নি। আদালত জানায়, এই পর্যায়ে মূল প্রশ্ন ছিল না যে বাসিন্দারা স্থায়ীভাবে সেখানে থাকার বৈধ অধিকার চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন কি না। বরং দেখতে হবে, তাঁরা এমন কোনও প্রাথমিক উপাদান দেখাতে পেরেছেন কি না, যা থেকে বোঝা যায় তাঁরা বাস্তবে ওই আবাসনে বসবাস করছেন। যদি তা হয়, তাহলে আইনে নির্ধারিত উচ্ছেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলে, “আধার কার্ড বসবাসের চূড়ান্ত প্রমাণ না হলেও, কোনও সম্পত্তিতে দখল বা বসবাসের প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে এটি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য।”

ডিভিশন বেঞ্চ আরও জানায়, আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র এবং গ্যাস সংযোগের বিল—এসব নথি আধার নিবন্ধন ব্যবস্থার অধীনে ঠিকানার বৈধ প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃত। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে এই নথিগুলি যথেষ্ট, যাতে Public Premises Act-এর ৪ ও ৫ ধারার অধীনে নির্ধারিত আইনি সুরক্ষা কার্যকর হয়।

হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, কাউকে অননুমোদিত দখলদার ঘোষণা করার আগে এস্টেট অফিসারকে প্রথমে নোটিশ দিতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আপত্তি জানানোর, প্রমাণ পেশ করার এবং ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সমস্ত নথি ও যুক্তি বিবেচনা করার পর কারণ-দর্শানো আদেশের মাধ্যমে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

আদালত মন্তব্য করে, “১৯৭১ সালের আইনের ৪ ও ৫ ধারায় অননুমোদিত দখলদারের জন্যও একাধিক স্তরের আইনি সুরক্ষা রাখা হয়েছে।” কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে এই বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়ার কোনওটিই অনুসরণ করা হয়নি।

হাইকোর্ট আরও জানায়, Public Premises Act-এর অধীনে ভাঙার ক্ষমতা শুধুমাত্র অননুমোদিত নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যমান আবাসিক ভবন, যেখানে মানুষ বসবাস করছেন, তা এই আইনের আওতায় সরাসরি ভেঙে ফেলার ক্ষমতা পোর্ট কর্তৃপক্ষের নেই।

পোর্ট কর্তৃপক্ষের এই যুক্তিও আদালত গ্রহণ করেনি যে ভবনগুলি পুরোনো ও বিপজ্জনক হওয়ায় সেগুলি ভেঙে ফেলা জরুরি। আদালতের মতে, যদি কোনও ভবন সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পৌর আইন অনুযায়ী উপযুক্ত পৌর কর্তৃপক্ষ সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। Public Premises Act ব্যবহার করে পোর্ট কর্তৃপক্ষ নিজে থেকে এই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে না।

আদালত আরও লক্ষ্য করে, পোর্টের নিজস্ব নথিতেই ওই এলাকাকে হাজার হাজার মানুষের বসবাসকারী আবাসিক কোয়ার্টার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ভবনগুলি পরিত্যক্ত বা ফাঁকা—এই দাবি তাদের নিজস্ব নথির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। এছাড়া কোনও বাসিন্দার নামে পৃথক আইনি নোটিশ জারির প্রমাণও আদালতের সামনে পেশ করা হয়নি।

সব দিক বিবেচনা করে কলকাতা হাইকোর্ট একক বেঞ্চের রায় বাতিল করে পোর্ট কর্তৃপক্ষকে ব্রুক লেনের CDLB ও CPT আবাসন ভাঙা এবং বাসিন্দাদের উচ্ছেদ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, কর্তৃপক্ষ চাইলে আইন অনুযায়ী Public Premises (Eviction of Unauthorised Occupants) Act, 1971-এর ৪ ও ৫ ধারার অধীনে নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।

কেস টাইটেল: Md. Idrish and Others v. Union of India and Others (M.A.T. No. 1072 of 2026, arising out of W.P.A. No. 12272 of 2026)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button