হাইকোর্ট

৪২ বছর আগের জমি সংঘর্ষ মামলায় চার নারীকে খালাস দিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট

প্রমাণের অভাবে চার নারী মুক্তি, দুই পুরুষের দণ্ড ও প্রবেশন বহাল রাখল আদালত

প্রায় ৪২ বছর আগে উত্তরপ্রদেশের ললিতপুর জেলায় কৃষিজমি নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি ফৌজদারি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত মামলায় অভিযুক্ত চার নারীকে সন্দেহের সুবিধা দিয়ে খালাস দিয়েছে। তবে দুই জীবিত পুরুষ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের দণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিচারিক আদালত যে প্রবেশনের (Probation) সুবিধা দিয়েছিল, তাও বহাল রেখেছে হাইকোর্ট।

মামলাটি ১৯৮৪ সালের একটি গ্রামীণ সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে। প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, ললিতপুর জেলার একটি কৃষিজমিতে অভিযোগকারীর পরিবার ভুট্টার চাষ করেছিল। পরে অভিযুক্তরা সেই জমিতে গিয়ে ফসল কাটতে শুরু করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে উভয় পক্ষের একাধিক ব্যক্তি আহত হন।

এই ঘটনায় উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকেও একটি পাল্টা মামলা করা হয়, যেখানে তাদের পক্ষের দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাও উঠে আসে। ফলে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধপূর্ণ মামলা হিসেবে বিচারাধীন ছিল।

আপিল শুনানিতে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৃতপক্ষে অভিযোগকারী পক্ষই প্রথমে আক্রমণ করেছিল এবং আত্মরক্ষার জন্যই তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এছাড়া বিচারিক আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি বলেও তারা দাবি করেন।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত। তাদের মতে, অভিযুক্তরা বেআইনিভাবে অভিযোগকারী পক্ষের চাষ করা ভুট্টা কাটতে শুরু করে এবং বাধা দেওয়া হলে হামলা চালায়। তাই বিচারিক আদালতের দণ্ডাদেশ আইনসম্মত ছিল।

সব পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট জানায়, এটি একটি ক্রস-কেস বা পাল্টা মামলার ঘটনা। আদালতের মতে, উপস্থাপিত প্রমাণ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়নি যে বিতর্কিত জমিতে আসলে কোন পক্ষ ভুট্টার চাষ করেছিল কিংবা সংঘর্ষের সূচনা কে করেছিল।

আদালত পর্যবেক্ষণ করে, জমির দখল ও ফসলের মালিকানা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা থাকায় প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি যে অভিযোগকারী পক্ষই একমাত্র বৈধভাবে সম্পত্তি রক্ষার অধিকারী ছিল।

রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করে, যখন প্রমাণ থেকে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না যে সংঘর্ষের সূচনা কে করেছে, তখন ঘটনাটিকে ‘ফ্রি ফাইট’ বা উভয় পক্ষের পারস্পরিক সংঘর্ষ হিসেবে গণ্য করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে কেবল তার নিজের কর্মকাণ্ডের জন্যই দায়ী করা যায়।

চার নারী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আদালত পৃথকভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে। আদালত দেখতে পায়, প্রসিকিউশনের সাক্ষীরাই স্বীকার করেছেন যে ওই নারীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তাদের কাউকে কাউকে আক্রমণ করতে দেখা যায়নি। এছাড়া তারা অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনো অভিন্ন উদ্দেশ্য (Common Object) নিয়ে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণও উপস্থাপন করা যায়নি।

এই পরিস্থিতিতে আদালত চার নারী অভিযুক্তকে সন্দেহের সুবিধা প্রদান করে তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ বাতিল করে খালাস দেয়।

তবে ভজন লাল এবং রামানন্দ নামে দুই জীবিত পুরুষ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে বলে আদালত মত দেয়। তাদের হামলায় অংশগ্রহণ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করে।

ফলে এই দুই অভিযুক্তের আপিল খারিজ করে তাদের দণ্ড বহাল রাখা হয়। তবে বিচারিক আদালত আগে থেকেই তাদের Probation of Offenders Act-এর অধীনে প্রবেশনের সুবিধা দিয়েছিল। হাইকোর্ট সেই সুবিধাও বহাল রেখে নির্দেশ দেয়, তারা বিচারিক আদালতে উপস্থিত হয়ে ভবিষ্যতে সুশৃঙ্খল আচরণ বজায় রাখার অঙ্গীকার করে নতুন বন্ড দাখিল করবেন।

কেস টাইটেল: Bhajan Lal & Others v. State of Uttar Pradesh

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button