তিন দশকের আইনি লড়াই শেষে প্রাক্তন সিআরপিএফ কর্মকর্তার বড় স্বস্তি সুপ্রিম কোর্টে
পদোন্নতির সুবিধা, বকেয়া বেতন ও সংশোধিত পেনশনের নির্দেশ দিল সর্বোচ্চ আদালত

প্রায় তিন দশক ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) এক কর্মকর্তাকে বড় স্বস্তি দিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ওই কর্মকর্তাকে পদোন্নতি-সংক্রান্ত চাকরির সমস্ত সুবিধা, বকেয়া বেতন এবং সংশোধিত অবসরকালীন সুবিধা দিতে হবে। তবে তাঁকে ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি) পদে পদোন্নতির দাবি আদালত গ্রহণ করেনি। একই সঙ্গে আদালত মন্তব্য করেছে, আগের বিচারিক নির্দেশ যথাযথভাবে কার্যকর না করায় এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে এই মামলা অযথাই বছরের পর বছর ধরে চলেছে। বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রনের ডিভিশন বেঞ্চ ২১ জুলাই ২০২৬ এই রায় দেয়।
মামলার পটভূমি
আবেদনকারী ১৯৮৬ সালে সিআরপিএফ-এ অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ ছিল, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দায়িত্ব হস্তান্তর করা এবং দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা।
বিভাগীয় তদন্ত শেষে ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এরপর তিনি একাধিকবার দিল্লি হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। আগের বিভিন্ন আদালতের নির্দেশে তাঁকে বরখাস্তের তারিখ থেকেই পুনর্বহাল (Reinstatement) করা হয় এবং গুরুতর শাস্তির পরিবর্তে লঘু শাস্তি (Minor Penalty) দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও তাঁর জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি এবং আর্থিক সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক চলতে থাকে।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা একটি সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভাগের অবহেলা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রন রায়ে উল্লেখ করেন, একজন সম্ভাবনাময় সিআরপিএফ কর্মকর্তার কর্মজীবন বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে কার্যকর না করার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আদালত আরও বলে, সাধারণত সাংবিধানিক আদালত বিভাগীয় তদন্তে দেওয়া সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে না, যদি না সেখানে গুরুতর আইনি ত্রুটি বা স্বেচ্ছাচারিতা থাকে। তবে আদালত যখন কোনো বিষয় পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেয়, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা। আগের সিদ্ধান্তকে যান্ত্রিকভাবে পুনরাবৃত্তি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
বেঞ্চ দেখতে পায়, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত আবেদনকারীর বিরুদ্ধে লঘু শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (ইউপিএসসি) মতামত ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার ফলে তাঁকে আবার চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ জারি করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, দিল্লি হাইকোর্ট আগেই এই প্রক্রিয়াকে আইনবিরোধী বলে চিহ্নিত করেছিল এবং সেই সিদ্ধান্তই সঠিক।
আদালতের দেওয়া স্বস্তি
তবে আবেদনকারীর ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি) পদে পদোন্নতির দাবি সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেয়। আদালতের মতে, ওই পদে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত তিনি পূরণ করেননি। তাই তাঁকে সেই পদে উন্নীত করার সুযোগ নেই।
তবে আদালত স্পষ্ট করে যে, তাঁর বিরুদ্ধে আরোপিত লঘু শাস্তির কার্যকারিতা ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে প্রথম বরখাস্তের তারিখ থেকেই গণনা করতে হবে। সেই হিসাবে শাস্তির মেয়াদ ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসেই শেষ হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে সেই শাস্তির অজুহাতে তাঁকে পদোন্নতির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা আইনসম্মত নয়।
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, আবেদনকারীকে ডেপুটি কমান্ড্যান্ট পদে সেই তারিখ থেকেই পদোন্নতির সুবিধা দিতে হবে, যেদিন তাঁর সমপদমর্যাদার অন্যান্য কর্মকর্তারা বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (DPC) সুপারিশ অনুযায়ী পদোন্নতি পেয়েছিলেন।
এর পাশাপাশি, তাঁকে সমস্ত চাকরিগত সুবিধা, বকেয়া বেতন এবং উচ্চতর বেতনক্রম অনুযায়ী অবসরকালীন ও পেনশন সংক্রান্ত সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করে দিতে হবে।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
মামলাটি দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট শর্তসাপেক্ষে বিচারাধীন আদালত অবমাননার মামলাগুলিও (Contempt Proceedings) খারিজ করে দেয়।
আদালত নির্দেশ দেয়, কেন্দ্র সরকারকে দুই মাসের মধ্যে আবেদনকারীকে মামলা পরিচালনার খরচ হিসেবে ১০ লক্ষ টাকা প্রদান করতে হবে।
এছাড়া আদালত জানায়, বকেয়া বেতন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার হিসাব ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করে আবেদনকারীকে পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না হলে বকেয়া টাকার উপর বার্ষিক ৭ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে।
সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট আবেদনকারীর সিভিল আপিল মঞ্জুর করে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারি করে।
কেস টাইটেল: Prakash Kumar Dixit v. Ajay Kumar Bhalla and Others
কেস নম্বর: Civil Appeal No. 9224 of 2026 (@ SLP (C) No. 10712 of 2025)



