খবরাখবর

‘আইনি লড়াই যেন ছায়াযুদ্ধ না হয়ে ওঠে’, অর্ণব গোস্বামীর মামলায় গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য বম্বে হাইকোর্টের

২০১৮ সালের বন্ধ মামলা ২০২০ সালে পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে রাজ্যের ক্ষমতার সীমা খতিয়ে দেখছে আদালত

আইনি প্রক্রিয়াকে কোনওভাবেই ‘ছায়াযুদ্ধ’ বা proxy kind of war-এ পরিণত করা উচিত নয়। রিপাবলিক টিভির এডিটর-ইন-চিফ অর্ণব গোস্বামীর ২০২০ সালের গ্রেফতার সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এমনই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করল বম্বে হাইকোর্ট।

শুক্রবার বিচারপতি মিলিন্দ যাদব-এর বেঞ্চে Arnab Goswami v. State of Maharashtra & Ors. মামলার শুনানি হয়। ২০২০ সালে গ্রেফতারের পর গোস্বামী এই মামলা দায়ের করে ২০১৮ সালে আলিবাগ থানায় দায়ের হওয়া FIR বাতিলের আবেদন করেছিলেন। সেই FIR-এ interior designer অনভয় নায়েকের আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

বন্ধ মামলা ফের খোলার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

শুনানিতে মহারাষ্ট্রের Chief Public Prosecutor শিশির হিরে আদালতকে জানান, এই মামলায় একটি closure report দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ২০২০ সালে মামলাটি আবার খুলে দেওয়া হয়।

গোস্বামীর হয়ে আইনজীবী নিরঞ্জন মুন্দারগি আদালতে দাবি করেন, কোনও বিচারিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই রাজ্য সরকার নিজস্ব উদ্যোগে তদন্ত পুনরায় শুরু করেছিল। তাঁর অভিযোগ, এই পদক্ষেপের পিছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করেছিল।

আইনজীবী সেই সময়ের মহা বিকাশ আঘাড়ি (MVA) সরকার-এর দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। ২০২০ সালে মহারাষ্ট্রে এই সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং সেই সময়ই মামলাটি পুনরায় খোলা ও অর্ণব গোস্বামীর গ্রেফতার হয়।

আদালতের সামনে মূল আইনি প্রশ্ন

দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি মিলিন্দ যাদব মামলার মূল আইনি প্রশ্নটি নির্দিষ্ট করে দেন—একবার কোনও মামলা বন্ধ হয়ে গেলে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কী ক্ষমতাবলে রাজ্য সরকার সেই মামলা পুনরায় খুলতে পারে?

বিচারপতি যাদব বলেন, প্রশ্ন হল রাজ্যের মামলা পুনরায় খোলার ক্ষমতা রয়েছে কি না এবং থাকলে কোন পরিস্থিতিতে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়

এই প্রসঙ্গেই বিচারপতির গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য, “This should not be a proxy kind of a war.”

তিনি বলেন, ভারত একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। গণতন্ত্রের সঠিকভাবে কাজ করার জন্য গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভের মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিচার বিভাগের ভূমিকা কী?

শুনানির সময় বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন বিচারপতি যাদব।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগ আইন তৈরি করে না এবং বিচারপতিরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও নন। একইভাবে সংবাদমাধ্যমও বিচার বিভাগের অংশ নয়; সংবাদমাধ্যমকে সাধারণত watchdog বা নজরদারির ভূমিকা পালনকারী হিসেবে দেখা হয়।

বিচারপতির কথায়, “We are the cementing authority between all three.”

অর্থাৎ আইনসভা, প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের মতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের একটি স্বতন্ত্র ভূমিকা রয়েছে।

২০২০ থেকে অনেকটাই সময় পেরিয়ে গিয়েছে

আদালত আরও উল্লেখ করেছে, “much water has flown since 2020”—অর্থাৎ ২০২০ সালের ঘটনা থেকে ইতিমধ্যেই অনেকটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিচারপতি উভয় পক্ষকেই মামলাটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বা fresh perspective থেকে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন।

অর্থাৎ পুরনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা সেই সময়কার সংঘাতের বাইরে গিয়ে বর্তমানে মামলার আইনি প্রশ্নগুলিকে কীভাবে দেখা যায়, সেটিই আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মামলাটির পরবর্তী শুনানি সম্ভবত ৪ সেপ্টেম্বর হবে।

কী হয়েছিল অনভয় নায়েক মামলায়?

অর্ণব গোস্বামীকে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০১৮ সালে interior designer অনভয় নায়েকের আত্মহত্যার ঘটনায়।

নায়েক ছিলেন Concorde Designs Pvt Ltd (CDPL)-এর পরিচালক। অভিযোগ ছিল, তিনি একটি সুইসাইড নোটে ₹৮৩ লক্ষ টাকা বকেয়া থাকার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এই অর্থের সঙ্গে রিপাবলিক টিভির parent company ARG Outlier Media-এর নাম যুক্ত করা হয়েছিল।

গোস্বামী তাঁর আবেদনে দাবি করেন, বকেয়া অর্থ পরিশোধের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু CDPL-এর অকার্যকর বা inoperative bank account-এর কারণে অর্থের নিষ্পত্তি সম্ভব হয়নি।

২০১৯-এ মামলা বন্ধ, ২০২০-তে ফের তদন্ত

গোস্বামীর আবেদনে আরও বলা হয়েছে, মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। Alibaug-এর Chief Judicial Magistrate একটি ‘A’ summary closure report গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর দাবি, এরপর ২০২০ সালে হঠাৎ তদন্ত পুনরায় শুরু করা হয়। গোস্বামী অভিযোগ করেন, তৎকালীন MVA সরকারের সময়ে এই পদক্ষেপের পিছনে রাজনৈতিক বিদ্বেষ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছিল।

তিনি আরও দাবি করেন, মহারাষ্ট্র বিধানসভায় তাঁর বিরুদ্ধে breach of privilege proceedings শুরু করার ঘটনাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল।

এখন নজর ৪ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে

বর্তমান শুনানিতে বম্বে হাইকোর্ট মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের দিকে নজর দিয়েছে—একবার বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনও মামলার তদন্ত পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে রাজ্যের ক্ষমতার সীমা কতটা?

একইসঙ্গে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক বা অন্য কোনও সংঘাতের proxy war বা ছায়াযুদ্ধে পরিণত না হয়।

২০২০ সালের ঘটনা থেকে সময় পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে উভয় পক্ষকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি দেখার পরামর্শ দিয়েছে আদালত।

ফলে এখন নজর থাকবে ৪ সেপ্টেম্বরের পরবর্তী শুনানির দিকে, যেখানে বন্ধ হয়ে যাওয়া মামলার তদন্ত পুনরায় খোলার আইনি বৈধতা নিয়ে আরও বিস্তারিত শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button