সামলেতি বাস বিস্ফোরণ মামলায় নতুন করে বিচার, সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নির্দেশ
ন্যায্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করে এক অভিযুক্ত খালাস, অন্যজনের পুনর্বিচারের নির্দেশ

প্রায় তিন দশক আগে রাজস্থানের দৌসা জেলার সামলেতি গ্রামের কাছে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বাস বিস্ফোরণ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত একদিকে ডা. আবদুল হামিদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বাতিল করে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে বিচার (De Novo Trial) করার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে সহ-অভিযুক্ত পাপ্পু ওরফে সেলিমকে সমস্ত অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের করা ছয়জন খালাসপ্রাপ্ত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আপিলও খারিজ করেছে।
বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার তিন সদস্যের বেঞ্চ ২১ জুলাই ২০২৬ এই রায় দেয়।
মামলার পটভূমি
১৯৯৬ সালের ২২ মে রাজস্থানের দৌসা জেলার সামলেতি গ্রামের কাছে একটি রাজস্থান রোডওয়েজ বাসে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এই বিস্ফোরণে ১৪ জন যাত্রীর মৃত্যু হয় এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হন।
ঘটনার পর দীর্ঘ তদন্তের মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ এবং এর পেছনের কথিত ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
২০১৪ সালে ট্রায়াল কোর্ট ডা. আবদুল হামিদসহ কয়েকজনকে দোষী সাব্যস্ত করে। ডা. হামিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে রাজস্থান হাইকোর্ট সেই দণ্ড ও দোষী সাব্যস্ত করার রায় বহাল রাখে। একই মামলার সংশ্লিষ্ট আরেকটি বিচারে পাপ্পু ওরফে সেলিমকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
সুপ্রিম কোর্ট প্রথমে পরীক্ষা করে দেখে, ডা. আবদুল হামিদের বিচার সংবিধানসম্মত ন্যায্য বিচারের (Fair Trial) মানদণ্ড পূরণ করেছিল কি না।
আদালত দেখতে পায়, বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তিনি কার্যকর ও যথাযথ আইনি সহায়তা পাননি। ফলে তাঁর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে, ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার ভারতের বিচারব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক সাংবিধানিক নিশ্চয়তা। কার্যকর আইনজীবীর সহায়তা ছাড়া কোনো ফৌজদারি বিচারকে ন্যায্য বলা যায় না। এটি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ।
আদালত আরও বলে, অভিযোগ যতই গুরুতর হোক না কেন, সংবিধান এবং আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
এই মৌলিক ত্রুটির কারণে সুপ্রিম কোর্ট ডা. আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে দেওয়া দোষী সাব্যস্ত করার রায় বহাল রাখতে অস্বীকার করে।
নতুন করে বিচারের নির্দেশ
তবে আদালত ডা. আবদুল হামিদকে খালাস দেয়নি। পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন করে বিচার করার নির্দেশ দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট রাজস্থান হাইকোর্টকে নির্দেশ দিয়েছে, জয়পুরে একজন অভিজ্ঞ বিচারকের অধীনে একটি বিশেষ আদালত (Special Court) গঠন করতে হবে। সেখানে মামলার বিচার আবার শুরু হবে এবং প্রসিকিউশনের সব সাক্ষীকে পুনরায় আদালতে হাজির করা হবে।
আদালত আরও নির্দেশ দেয়, ডা. আবদুল হামিদকে দক্ষ আইনজীবীর সহায়তা দিতে হবে এবং প্রত্যেক সাক্ষীকে জেরা করার পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বেঞ্চ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বিশেষ আদালত এই মামলার বিচার করবে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে। ট্রায়াল কোর্ট, হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায়ে মামলার মূল অভিযোগ সম্পর্কে যে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, তা নতুন বিচারে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
আদালত আরও জানায়, নতুন বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ডা. আবদুল হামিদ বিচারবিভাগীয় হেফাজতেই থাকবেন। তবে তিনি চাইলে বিশেষ আদালতে জামিনের আবেদন করতে পারবেন এবং সেই আবেদন আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হবে।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সুপ্রিম কোর্ট পাপ্পু ওরফে সেলিমের আপিল মঞ্জুর করে তাঁর বিরুদ্ধে দোষী সাব্যস্ত করার রায় বাতিল করেছে এবং সব অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দিয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, অন্য কোনো মামলায় প্রয়োজন না থাকলে তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
এর ফলে তাঁর স্থায়ী প্যারোলের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের করা আপিল অকার্যকর (Infructuous) হয়ে যায় এবং সেটিও খারিজ করা হয়।
এছাড়া জাভেদ খান, আবদুল গনি, লতিফ আহমেদ বাজা, মহম্মদ আলি ভাট, মির্জা নিসার হুসেন এবং রইস বেগ—এই ছয়জনের খালাসের বিরুদ্ধে রাজস্থান সরকারের করা আপিলও সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেয়। ফলে তাঁদের খালাসের রায় বহাল থাকে।
সবশেষে আদালত স্পষ্ট করে জানায়, ডা. আবদুল হামিদ সম্পর্কে এই রায়ে করা পর্যবেক্ষণ শুধুমাত্র তাঁর আগের বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে। নতুন করে যে বিচার হবে, সেখানে বিশেষ আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।
কেস টাইটেল: Dr. Abdul Hameed v. State of Rajasthan (Connected Appeals)
কেস নম্বর: Criminal Appeal Nos. 1827–1829 of 2019 & Connected Matters


